১
এই গল্প দুজন মানুষকে ঘিরে, তাঁদের একজন বটুকেশ্বর বটব্যাল মানে সবার প্রিয় বটুকবাবু। তিনি নিরীহ স্বভাবের কৌতুকপ্রিয় এক মানুষ এবং ভারী মিশুকে। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে অনায়াসে তিনি মিশে যেতে পারেন। এই কারণে তাঁর অফিসে তিনি সবার খুব কাছের লোক, সবার প্রিয় বটুকদা – লোকের মুখে এই ডাকনামটা শুনতেই তিনি বেশী পছন্দ করেন। বটুকবাবুর কোনো আবেগই খুব তীব্র নয়। রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, অভিমান – সবকিছুর মাঝেই তিনি কোথা থেকে ঠিক হাস্যরস আমদানি করেন। তাই তাঁর কোনো আবেগই চড়া সুরে পৌছায় না। বটুকবাবু গান শুনতে ভালবাসেন, প্রতিদিন অফিস থেকে বাড়ী ফিরে তিনি রেডিওতে পুরানো দিনের বাঙলা গান শোনেন।
রোগা পাতলা চেহারার এই মানুষটি কিন্তু বেশ ভোজনরসিক। তাঁর সবথেকে প্রিয় মাছের ঝোল। ছোটবেলায় মার হাতে রান্না করা মাছের ঝোলের স্বাদ এখনও তাঁর মুখে লেগে আছে!বাস্তবে স্বাদের ব্যাপারে বটুকবাবু বেশ খুঁতখুঁতে। রান্নার ফোড়ন থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্তে যোগ করা মশলা অবধি প্রতিটি উপকরণের স্বাদ তিনি তাঁর মুখের ভিতর আলাদা আলাদা করে বুঝতে পারেন।
মানুষের জিভ পাঁচরকম স্বাদের আস্বাদ পায় – টক, ঝাল, মিষ্টি, নোনতা ও উমামি। এদের মধ্যে উমামি এমন একটি স্বাদ যা খিদে বাড়াতে সাহায্য করে। এইসব স্বাদ গ্রহণের জন্য জিভে স্বাদ কোরক থাকে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে জিভে এই স্বাদের অনুভূতি ক্রমশ কমে যায়। কিন্তু বটুকবাবু এই নিয়মের এক জলজ্যান্ত ব্যতিক্রম। তাই রান্নায় কোনোকিছু কম বেশী হলে, তা সহজেই তিনি টের পান।
রবিবার ছুটির দুপুরে স্ত্রী পরমাকে নিয়ে বটুকবাবু খেতে বসেছেন। পাতে তাঁর প্রিয় কাতলা মাছের ঝোল, তা দিয়ে ভাত মেখে প্রথম গ্রাস মুখে তুলেই তিনি রেরে করে উঠলেন! তাঁর গিন্নি জিজ্ঞাসা করলেন – “ কি হল?” মুখ বেজার করে বটুকবাবু বললেন – “ এটা মাছের ঝোল হয়েছে? রান্নার মাসীকে বল এতে কয়েকটা কিসমিস ছড়িয়ে দিতে, তাহলেই পায়েস হয়ে যাবে!” পরমা তাঁর কর্তার স্বাদ নিয়ে খুঁতখুঁতেপনার কথা ভালভাবে জানেন, তাই তিনি চুপ করে রইলেন। বটুকবাবু তখন আর কীই বা করেন! ছোটবেলায় খাওয়া সেই মাছের ঝোলের স্বাদ চিন্তা করে তিনি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর নিরুপায় হয়ে বাধ্য ছেলের মত সামনের বাটিতে রাখা মাছের ঝোলে চুমুক দিলেন।
২
এই গল্পের অপর মানুষটি হলেন ভজগোবিন্দ ভট্টাচার্য ওরফে ভজবাবু। তিনি একজন গম্ভীর প্রকৃতির রাশভারী লোক।ভজবাবু সহজে কারও সাথে মেশেন না। তিনি হাসি ঠাট্টাও খুব একটা পছন্দ করেন না। এমনকি লোকে তাঁকে তাঁর ডাকনাম ধরে ডাকলেও তিনি বিরক্তই হন। রেগে গেলে ভজবাবুর মাথার ঠিক থাকে না, তখন তিনি সামনে যাকে পান, তাকেই দুচার কথা শুনিয়ে দেন। তাঁর এই স্বভাবের জন্য তাঁর অফিসের বাকী লোকজন তাঁকে বেশ সমঝে চলে।
গোলগাল চেহারার এই মানুষটি কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভারী আবেগপ্রবণ। তিনি তাঁর স্ত্রী সরমাকে হারিয়েছেন বছর পাঁচেক আগে। নিঃসন্তান এই মানুষটি তাই মাঝে মাঝে একাকীত্বে ভোগেন। মন খারাপ হলে ভজবাবু তাঁর প্রিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পুরানো রেকর্ডগুলি বাজিয়ে শোনেন। এতে তাঁর ভারী মন খানিকটা হলেও হালকা হয়।
অন্যসব ব্যাপারে আলাদা হলেও বটুকবাবুর সাথে তাঁর মিল একটাই – ভজবাবুও খেতে খুব ভালবাসেন। পাড়ার বাজারে গেলে থলে হাতে তাঁর নিয়মিত দেখা মেলে। সেইসময় তাঁকে ভাল করে লক্ষ্য করলে জানা যাবে যে তিনি ছোটমাছ খেতে খুবই পছন্দ করেন। পুঁটি, মৌরলা, কাচকি – এইসব মাছ দিয়ে তৈরী পদ ভজবাবুর ভীষণ প্রিয়।
বাঙালীর রসনায় মাছের ঝোল এবং ঝাল দুইই সমান জনপ্রিয়। মাছের ঝোল রান্না করতে মূলত জিরে, ধনে ও অন্যান্য হালকা মশলাই কম পরিমাণে ব্যাবহার করা হয়। পাতলা ঝোলের মধ্যে মাছটিকে ধিমে আঁচে অনেকক্ষণ ধরে ফুটিয়ে পদটিকে আরও সুস্বাদু করে তোলা হয়। অন্যদিকে মাছের ঝাল তৈরীতে সর্ষের মত অপেক্ষাকৃত ভারী মশলার ব্যবহার হয় বেশী। মাছটিকে মাঝারি থেকে কড়া আঁচে মশলায় ভাল করে কষিয়ে জিভে জল আনা এই পদটি রান্না করা হয়। বড় বা মাঝারি আকারের মাছ এই দুই পদেই ব্যবহার করা যায়, তবে ছোটোমাছ সচরাচর মছের ঝালেই ব্যবহৃত হয়।
ভজবাবুর স্ত্রী সরমা খুব ভাল রাঁধতে পারতেন। তাঁর হাতে রান্না করা মৌরলা মাছের ঝাল ছিল ভজবাবুর কাছে অমৃত। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর রান্নায় সেই স্বাদ আর তিনি ফিরে পাননি। রান্নার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে হওয়ার জন্য কোনো রান্নার লোকই তাঁর বাড়ীতে বেশীদিন টেকে না! বাধ্য হয়ে নিজের রান্না এখন তিনি নিজেই করেন। তবে তিনি নিজেও মৌরলা মাছের ঝালে সেই নিখুঁত স্বাদ আনতে পারেন নি। সেই রান্নায় একটা কিছুর অভাব থেকেই যায়, যা তিনি বুঝতে পারেন, কিন্তু কিছুতেই সেই অভাব পূরণ করে উঠতে পারেন না। এখনও মৌরলার ঝালে তিনি সরমার রান্নার স্বাদ খোঁজেন, হয়তো সেই খোঁজার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে মানুষটারই আবার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেন!
৩
বটুকবাবু আর ভজবাবু একই কোম্পানিতে চাকরী করেন, তবে তাঁদের ডিপার্টমেন্ট আলাদা। বটুকবাবু মাসখানেক হল প্রোডাকশন ডিপার্টমেন্টের সুপারভাইজার হয়ে এসেছেন, আর ভজবাবু স্টোরেজ ডিপার্টমেন্টের বড় অফিসার। তাঁদের কোম্পানি রান্নার জন্য নানারকম মশলা প্রস্তুত করে। গতমাসে কোম্পানির কাছে মশলার গুণগত মান নিয়ে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে। কোম্পানির মালিক গজানন গাঙ্গুলী তাঁদের দুজনকেই নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন।
গজাননবাবুর মাথাটি তাঁর নামের সাথে একেবারে মানানসই। তিনি এমনিতে মানুষ ভাল, তবে রেগে গেলে তাঁর ইংরেজিটা কেমন জানি তালগোল পাকিয়ে যায়। তিনি তাঁর অফিসের ঘরে বটুকবাবু আর ভজবাবুকে পাশাপাশি বসিয়ে চড়া স্বরে বললেন – “আপনাদের জন্যে তো দেখছি আমার কোম্পানিটা এবার লাটে উঠবে মশাই! এতো অভিযোগ আসছে, আর আপনাদের কোনো হেলদোলই নেই। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে এই ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত আপনাদের দুজনের কোনো কথাই হয়নি। এই গাফিলতি কিন্তু আমি বরদাস্ত করবো না! কল ফর আ মিটিং ইমিডিয়েটলি! টক ইজ দ্য ওনলি সলিউশন। আপনারা দুই ডিপার্টমেন্টের লোকজন কথা বলে কালকের মধ্যে আমাকে রিপোর্ট জমা দেবেন, নতুবা আমাকে আপনাদের অল্টারনেট খুঁজে দেখতে হবে!”
বসের কাছে কচুকাটা হয়ে বটুকবাবু আর ভজবাবু নিজের নিজের ঘরে ফিরে এলেন। সেদিন দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে ভজবাবুকে লাঞ্চ করতে দেখে বটুকবাবু নিজেই এগিয়ে গেলেন তাঁর সাথে কথা বলতে। খানিকক্ষণ কথাবার্তা চলার পর তাঁদের মাঝের জড়তা কেটে গেল। আলাপচারিতার মাঝে তাঁরা জানতে পারলেন যে তাঁরা দুজনেই ভোজনরসিক। অফিসের কাজের বাইরেও একে অপরের সাথে কথা বলার যোগসূত্র তাঁরা খুঁজে পেলেন। বটুকবাবু আর ভজবাবু নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতেই বুঝতে পারলেন যে আসল সমস্যাটা কোথায়! সেই সমস্যার সমাধানও তাঁরা সহজেই খুঁজে পেলেন। তাঁরা দুজনেই মনে মনে উপলব্ধি করলেন যে বসের বলা কথাগুলিই ঠিক – “টক ইজ দ্য ওনলি সলিউশন!”
পরের দিন যথাসময়ে বসের কাছে রিপোর্ট জমা পড়লো, গজাননবাবুর কোম্পানিও সে যাত্রায় রক্ষা পেল।
৪
সেদিন বাড়ী ফিরে বটুকবাবু তাঁর গিন্নিকে দিয়ে রান্নার মাসীকে বলিয়ে মাছের ঝোলে কয়েক ফোটা লেবুর রস যোগ করালেন। রাতে খেতে বসে বটুকবাবু মাছের ঝোলে বহুবছর পর তাঁর মায়ের রান্নার স্বাদ ফিরে পেলেন।
ভজবাবুও সেদিন বাড়ী ফিরে মৌরলার ঝাল রান্নার সময় মনে করে তাতে কয়েক ফোটা তেঁতুলগোলা জল যোগ করলেন। রাতে খাওয়ার সময় তাঁর মনে হল যে তিনি আর একা নন, সরমা ফিরে এসে ঠিক যেন আগের মতই তাঁর পাশের চেয়ারে বসে আছেন!
সেদিন রাতের খাওয়া শেষ করে ভজবাবু বটুকবাবুকে ফোন করলেন। ফোনের দুই প্রান্তে দুটি ভিন্ন মানুষের গলার স্বর সেদিন পরম প্রাপ্তির আনন্দে এক হয়ে গেল। স্বাদের অনুভূতির মিলে তাঁদের মনের মাঝের দুই মেরুর ব্যবধান নিমেষে উধাও হল। উত্তেজিত কণ্ঠে তাঁরা একে অপরকে সেদিন রাতের খাবারের অনন্য অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে লাগলেন। কথার মাঝে বটুকবাবু আর ভজবাবু টেরই পেলেন না যে কখন তাঁরা দুটি ভিন্ন স্বাদের মানুষ, ঝোলে আর ঝালে মিশে একাকার হয়ে গেলেন !
****************

