১
গরমের ছুটিতে তিতাস এসেছে বাতাসপুর গ্রামে তার দাদু দিদার বাড়ীতে। তিতাসের দাদু গত হয়েছেন প্রায় বছর পাঁচেক আগে, তার দিদা মোক্ষদা এখন তাঁর চাকর বাকরদের সাথে নিয়ে এই বাড়ীতে থাকেন। বাড়ীর নাম অলীক স্বপ্ন। বাড়ীটা দেখতে গ্রামের আর পাঁচটা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের বাড়ীর মত, ঝা চকচকে না হলেও অনেকটা জায়গা জুড়ে তার ব্যাপ্তি। দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় যে এককালে বাড়ীটার যথেষ্ট শ্রী ছিল, কিন্তু ইদানিং কোনো কারণে তার যত্নের সামান্য অভাব ঘটেছে।
তিতাসের জন্ম এই গ্রামেই। তার জীবনের প্রথম কয়েকটা বছর কেটেছে দাদু দিদার সান্নিধ্যে এই বাতাসপুরে। সেইসময় সে তার দিদুনের ভারী ন্যাওটা ছিল। মোক্ষদাকে তিতাস দিদুন বলেই ডাকে। পৌষের দুপুরে বাড়ীর সবাই ভাতঘুম দিলে মোক্ষদা যখন রান্নাঘরে একা একা পাটিসাপটার পিঠে বানাতেন, তিতাস তখন রান্নাঘরের ঠিক উপরে ছাদের চিলেকোঠার জানালায় বসে দিদুনের ডাকের অপেক্ষা করতো। নতুন চাল আর নলেন গুড় দিয়ে বানানো গরম পিঠের মিষ্টি গন্ধে চারদিক যখন ম ম করে উঠতো, ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে মোক্ষদার নরম ডাক পৌঁছে যেত তাঁর আদরের দিদিভাইয়ের কানে। বাড়ীর বাকী লোকজন তাদের এই গোপন আঁতাতের কথা ঘুণাক্ষরেও টের পেত না! পৌষের সেই ভরদুপুরে পিঠে খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই অসমবয়সী মানুষের মাঝে সম্পর্কের এক অপূর্ব মায়াজাল রচনা হত।
সেই আঁতাত আর নেই। বছর সাতেক আগে তিতাসের বাবা অনিমেষ কর্মসূত্রে কলকাতায় বদলি হয়ে যান। সেই সাথে তিতাস ও তার মাও পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে যায়। কলকাতায় গিয়ে প্রথম প্রথম দিদুন আর বাতাসপুরের কথা ভেবে তিতাসের মন কেমন করতো। কিন্তু সময়ের সাথে সেই নাড়ীর টান কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন তারা বছরে একবারই দুর্গাপূজার সময় বাতাসপুরে আসে। এই বছর পূজার সময় বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান থাকায় তিতাস একাই তার গরমের ছুটিতে বাতাসপুরে এসেছে। তার আসার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। গরমের ছুটি সে তার বন্ধুবান্ধবদের সাথে কলকাতাতেই কাটাবে বলে ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু মা বাবা একপ্রকার জোর করেই তাকে দিদুনের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এতে তিতাস বেশ বিরক্তই হয়েছে। সে বড় হয়েছে, এখন সে ক্লাস এইটের ছাত্রী, তার কাছে নিজের মতামতের গুরুত্ব এখন সবচাইতে বেশী।
আর যে জিনিষটার গুরুত্ব তার কাছে বেশী – তা হল তার মোবাইল ফোন! মোবাইল ফোন হাতে পেলে সে আর কিছু চায় না, তখন গোটা পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গোটা জীবনটাই সে কাটিয়ে দিতে পারে। আসলে কলকাতায় গিয়ে প্রথম প্রথম তিতাস যখন তার আশেপাশে বাতাসপুরের চেনা মুখগুলোকে খুঁজতো, তখন এই মোবাইল ফোনকেই সে পাশে পেয়েছিল। একাকী সময় কাটানোর সেই মাধ্যম এখন ধীরে ধীরে তার নেশায় পরিণত হয়েছে। আশেপাশের নিঃসঙ্গতা কাটাতে যে মোবাইল একদিন সে হাতে তুলে নিয়েছিল, সেই মোবাইলই এখন তার আশপাশকে নিঃসঙ্গ করে দেয়!
মোক্ষদার নিঃসঙ্গতা আবার অন্য কারণে। স্বামী ও পরিবার নিয়ে এই বাতাসপুরে যে মায়ার সংসার তিনি বেঁধেছিলেন, তা আজ আর নেই। অদৃষ্ট প্রথমে তাঁর আদরের দিদিভাইকে তাঁর থেকে দূরে ঠেলে দিল। সেই দুঃখ কাটিয়ে ওঠার আগেই তাঁর স্বামীও তাঁকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে গেলেন। এই জোড়া আঘাতে তিনি মানুষটাই কেমন যেন গুটিয়ে গেলেন। সেই হাসিখুশি খোলামেলা মনের মানুষটি আজকাল নিজেকে আঘাত পাওয়া শামুকের মত খোলসের ভিতর গুটিয়ে রাখেন। সেই খোলস ভেদ করে তাঁর কাছের লোকরাও আর আসল মানুষটার নাগাল পায় না। এই পরিবর্তন বুঝতে পেরে তিতাসের মা বাবা তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার বহু চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মোক্ষদা এই বয়সে আর তাঁর শেকড় ছেড়ে যেতে চান না। সবকিছু আবার আগের মত ফিরে পাওয়ার অলীক স্বপ্ন নিয়ে এই বাতাসপুরেই তিনি বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিতে চান।
বাতাসপুরও মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গতায় ভোগে। তার পাশ দিয়ে তির তির করে বয়ে চলে সুপ্তি নদী। নদীর অপর পাড়ের গ্রাম নিশ্চিন্দিপুর। নদীর উপর দিয়ে বয়ে চলা হাওয়ায় বাতাসপুর মাঝে মাঝেই নিশ্চিন্দিপুরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু নদীর অপর পাড় থেকে কোনো সাড়াই সে পায় না! বাতাসপুরের লোকজন কেউ নিশ্চিন্দিপুরে যেতে সাহস করে না। কারণ সেই গ্রামে একবার গেলে নাকি কেউ আর ফিরে আসে না!
২
বাতাসপুরে বৈশাখমাসের এক সকাল, সুপ্তি নদীর জলের উপর দিয়ে ভোরের হালকা বাতাস বইছে, সূর্যদেব এখনও তাঁর রুদ্রমূর্তি ধারণ করেননি। তিতাস মর্নিং ওয়াকে বেড়িয়েছে, হাতে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী মোবাইল ফোন। এইসময়টা সুপ্তি নদীর পাড় ধরে হেঁটে বেড়াতে তার খুব ভাল লাগে। ছোটবেলায় সে এই পথ দিয়েই দিদুনের সাথে ঘুরতে যেত। সেই দিনগুলির মত এখনও সুপ্তি নদীর বুকে জেগে থাকা বালির চরে সূর্যের আলো পড়ে সোনার মত চিকচিক করছে। তিতাসের মনে হল সবকিছু সব আগের মত হয়েও যেন ঠিক আর আগের মত নেই। এইসব ভাবতে ভাবতে তার চোখ পড়লো নদীর অপর পাড়ে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের এক বাঁশবাগানে। ছোটবেলা থেকেই নদীর অপর পাড়ের গ্রামটির প্রতি সে এক দুর্নিবার টান অনুভব করে। অপর পাড়ে যাওয়ার কাঠের সাঁকো, নিশ্চিন্দিপুরের বাঁশবাগান, মাটির ছোট ছোট কুঁড়েঘর – সবকিছুই তার কাছে কেমন যেন আপন বলে মনে হয়। কিন্তু লোকে বলে যে সে গ্রামে এক পেত্নী থাকে। কোনো বাইরের লোক সেখানে গেলেই, সেই পেত্নী তাকে ভুলিয়ে আপন করে নেয়। তখন সেই লোক আর নিশ্চিন্দিপুর থেকে ফিরে আসে না। সেই পেত্নীর ভয়ে তাই বাতাসপুর গ্রামের কেউই সেই গ্রামের পথে পা বাড়ায় না। নিশ্চিন্দিপুরের কথা ভেবে তিতাসের মনের ভিতর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস পড়লো। আজকাল দিদুন আর নিশ্চিন্দিপুরের মধ্যে সে ভারী মিল খুঁজে পায় – দুটোই তার এত কাছে অথচ কোনোটারই সে নাগাল পায় না!
নদীর ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিতাস দেখতে পেল যে একটা বাচ্চা ছেলে নদীর জলে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। তার বয়স বড়জোর দশ কী বারো, পড়নে হাফ হাতা জামা আর হাফ প্যান্ট। তার মাথার চুলগুলো সজারুর কাঁটার মত, আর সবথেকে অদ্ভূত তার মূলোর মত কান দুটো। তিতাস এমনিতে অচেনা কারও সাথে কথা বলে না, কিন্তু এই ছেলেটিকে দেখে তার কেন জানি কথা বলতে ইচ্ছা করলো! তিতাসের পায়ের শব্দ শুনে ছেলেটিও তার দিকে ফিরে তাকালো। তিতাস তার গলার স্বরে নকল গাম্ভীর্য এনে জিজ্ঞাসা করলো – “তুই কে?” প্রশ্ন শুনে বাচ্চা ছেলেটি জবাব দিল – “আমি বঙ্কু !” তার জবাব শুনে তিতাসের ভারী হাসি পেল। ছেলেটার যেমন তালপাতার সেপাইয়ের মত গড়ন, তেমনি তার নাকিসুরে কথা বলার ধরন। কোনোরকমে হাসি চেপে তিতাস বললো – “ বঙ্কু, বাবা নাম বটে! তা তুই এখানে কি করছিস? তোকে আগে তো কখনও এদিকে দেখিনি!” বঙ্কু তার নাকিসুরে আমতা আমতা করে বললো – “সে আর দেখবে কেমনে! আমার বাসা যে নিচ্ছিন্দিপুরে গো, আমার বাসায় আজ মহাভোজ। তাই ঠাম্মা বললে নদী থেকে মাছ ধরে আনতে। আমার গাঁয়ের দিকটায় তো মাছ ভাল পাওয়া যায় নে, তাই এদিকটায় এয়েছি মাছ ধরতে।” বঙ্কুর কথা বলার ধরনে তিতাস ভারী মজা পেল। তার উপর জীবনে এই প্রথম সে নিশ্চিন্দিপুরের কোনো মানুষকে চাক্ষুষ দেখলো। প্রবল আগ্রহ নিয়ে তিতাস তাকে বললো – “কিন্তু সেই গ্রামে তো শুনেছি এক পেত্নী থাকে। কেউ সেখানে গেলে সেই পেত্নী নাকি তাকে আটক করে রাখে! তাই ভয়ে কেউই সেখানে যায় না।” বঙ্কু তার জোনাকির মত ছোট ছোট চোখ দুটো পিটপিট করে বললো – “তুমি কি পান্তা বুড়ীর কথা কইছো? সে অভাগী তো রেতেরবেলা ঐ বাঁশবাগানের পাশে অমলতাস গাছের মাথায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকে আর কাঁসার থালায় করে পান্তাভাত আর মাছভাজা খায়।” পান্তা বুড়ীর কথা শুনে তিতাসের নিশ্চিন্দিপুর ঘুরে দেখার ইচ্ছা আরও প্রবল হল। সে ভেবে দেখলো যে পেত্নীর ভয় থাকলেও সে তো রাতেরবেলা, এখন নিশ্চিন্দিপুর গেলে সে বেলায় বেলায় বাতাসপুরে ফিরে আসতে পারবে। নিজের মনে সাহস জুগিয়ে সে বঙ্কুকে বললো – “আমাকে তোদের গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাবি?” বঙ্কু বললো – “সে আর বলতে! দুপুরে কিন্তু তুমি আমার বাসায় খাবা, নইলে ঠাম্মা আবার নাগ করবেন।” তিতাস বঙ্কুর প্রস্তাবে এককথায় রাজী হয়ে গেল।
তারপর সুপ্তি নদীর উপরের সেই নিষিদ্ধ কাঠের সাঁকো পেরিয়ে এক সম্পূর্ণ অজানা মানুষের সাথে তিতাস পা বাড়ালো নিশ্চিন্দিপুরের দিকে। অজানাকে জানার প্রবল আগ্রহ থেকেই কী সে এই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিল? নাকি অবচেতন মনে কোনো ঘোরের মধ্যে সে অজানা পথে পা বাড়ালো তা কেবল সময়ই বলতে পারবে!
৩
নিশ্চিন্দিপুরে প্রবেশ করে বঙ্কু তিতাসকে প্রথমে নিয়ে গেল তাদের গ্রামের একমাত্র ডাক্তারের বাড়ী। তিনিও আজ বঙ্কুর বাড়ী আমন্ত্রিত। ছোট কুঁড়েঘরেই ডাক্তারবাবুর ডিসপেনসারি, তবে এখন সেখানে কোনো রোগী নেই। তিতাসের সাথে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বঙ্কু বললো – “ইনি নিচ্ছিন্দিপুরের মস্ত বড় ডাক্তার ছ্রি নিদারুণ সোম। ডাক্তারবাবুর এমনিতে পছার ভালো, তবে আজ সোমবার কিনা তাই রোগীর দেখা মেলা ভার!” ডাক্তারবাবু তিতাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন – “হ্যাঁ, নামের মহিমায় সোমবারটা আমার হালকাই যায়। ভীষণ বিপদে না পড়লে আজ আর এদিকটায় কেউ আসবে না। এমনিতেও গ্রামে ঘুমের ব্যামো ছাড়া তো তেমন কোনো রোগ নেই।” তিতাস অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকায় ডাক্তারবাবু বললেন – “এই নিশ্চিন্দিপুরের মানুষ দিনের বেলায় ঘুমিয়ে রাত জাগতেই বেশী পছন্দ করে কিনা তাই ঘুমের বড়ি দিয়েই তাদের দিনের বেলায় ঘুম পাড়াতে হয়! তা তুমি গ্রামে নতুন বুঝি? বেশ বেশ যাও বঙ্কুর সাথে গ্রামটা ঘুরে দেখ, দেখবে সবকিছু কেমন আপন বলে মনে হবে! তারপর দুপুরে তো দেখা হচ্ছেই।”
ডাক্তারবাবুর বাড়ী থেকে বেড়িয়ে তিতাস বঙ্কুকে বললো – “চল আগে বাঁশবাগানটা ঘুরে আসি।” বঙ্কু বললো – “শুধু একজনার বাড়ী নেমন্তন্ন করা বাকী, তারপর বাঁশবাগান ঘুরে ভিটেয় যাবক্ষনে।” বঙ্কুর কথামত তারা দুজনে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের মেঠো পথ ধরে এগিয়ে চললো। বেশ খানিকক্ষণ চলার পর শালুকভরা নীলদিঘীকে পিছনে ফেলে তারা এসে পৌঁছালো এক জরাজীর্ণ বাড়ীর দোরগোড়ায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্কু তিতাসকে বললো – “এই বাড়ী চমকদার পাকড়াশীর। তিনি বিজ্ঞানী, কীসব পরীক্ষে নিরীক্ষে করেন। তুমি ভিতরে ঢুকতে পারবে না, গন্ধমাদনের জন্য ভারী কটু গন্ধ ভিতরে। গন্ধমাদন ওনার পোষা চামচিকে। চমকদার পাকড়াশীর গবেষণায় যখন কিছু আটকে যায়, তখন তিনি একটা হাত দিয়ে নিজের মাথা চুলকান, আর আরেকটা হাত দিয়ে পোষা চামচিকের ভুঁড়ি, আর মুখে খালি বলেন গুজুগুজু! ব্যাস, তাতেই তাঁর মাথায় চিন্তার জট খুলে যায়! কিন্তু তিনি মস্ত জ্ঞানী মানুষ। আমি এই যাব আর আসবো, তুমি এইখানটাতেই দাঁড়াও।” এই বলে বঙ্কু পাকড়াশীর বাড়ীর ভিতর চলে গেল। তিতাস দেখলো যে বেলা গড়িয়ে প্রায় এগারোটা বাজতে যায়। এতক্ষণে তার নজর পড়লো হাতের মোবাইলটার উপর। বঙ্কুর সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে মোবাইলটার অস্তিত্ব সে প্রায় ভুলে যেতেই বসেছিল। এখন মনে হল, বাঁশবাগানে গিয়ে মোবাইলে কয়েকটা ছবি তুলতেই হবে। তারপর বাড়ী ফিরে বাতাসপুরের সবাইকে সেই ছবিগুলো দেখিয়ে তাদের মিথ্যা ভয় সে দূর করবে। এমন সময় বঙ্কু ফিরে এসে বললো – “চলো, এবার বাঁশবাগানে যাওয়া যাক।
নিশ্চিন্দিপুরের বাঁশবাগান দিনের বেলাতেও বেশ আলো – আঁধারী। ছোটবেলার কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছে তিতাসের বেশ গা ছমছম করতে লাগলো। মনের ভিতর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা ভয়কে চাপা দেওয়ার চেষ্টায় তিতাস তার হাতের মোবাইলে বাঁশবাগানের ছবি তোলার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই সে ছবি স্পষ্ট করে তোলা গেল না। তখন তিতাস বঙ্কুকে বললো – “আয় তো, একসাথে একটা ছবি তুলি।” বঙ্কু বললো – “আমায় কি আর ছবিতে ঠিক করে দেখা যাবে!” বলেই সে তার কোদালের মত বড় বড় দাঁত বার করে হাসতে লাগলো। তিতাসের মনে হল বঙ্কু তাকে ইচ্ছা করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। সে ধমক দিয়ে বলে উঠলো – “মানে?” ধমক খেয়ে বঙ্কুর হাসি বন্ধ হল। সে তখন নাকিসুরে বললো – “না মানে বাগানে যা আবছা আলো, তাতে ছবি কি আর ঠিক করে উঠবে?” তিতাস আর কথা না বাড়িয়ে বঙ্কুর সাথে একটা ছবি তুলেই ফেললো। মোবাইল স্ক্রিনে সে দেখলো যে ছবিটায় আলো কম থাকলেও তাদের দুজনকেই বেশ পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে। ছবি তোলা পর্ব শেষ হলে তারা বাঁশবাগান থেকে বেড়িয়ে বঙ্কুর বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হল।
বঙ্কুর বাড়ী যাওয়ার পথে তিতাসের চোখে পড়লো নিশ্চিন্দিপুরের সেই বিখ্যাত অমলতাস গাছটি। গাছটির মাথা থেকে অসংখ্য ফুলের ঝুড়ি নীচে নেমে এসেছে। গোছা ভরা সেই হলুদ ফুলের রঙ এতটাই উজ্জ্বল যে দেখলে মনে হয় ঝুড়িগুলির মাথায় কেউ যেন আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। অসংখ্য ফুলের হলুদ আভায় গাছের চারপাশটা কেমন যেন একটা মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। তার সাথে যোগ হয়েছে ফুলের মিষ্টি গন্ধ। ফুলের বর্ণ গন্ধ মিশে গিয়ে এক স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি করেছে। তিতাসের মনে হল হঠাৎ করে সে যেন এক অলৌকিক পরিবেশে এসে পড়েছে!
৪
তিতাসের মনের ভাব বুঝতে পেরে বঙ্কু তার বিশ্রী গলার স্বর যতটা সম্ভব মোলায়ম করে বললো – “কী ছুন্দর না! রেতের বেলায় এই গাছটা চাঁদের আলোয় আরও ছুন্দর লাগে।! তখন পান্তা বুড়ী এই গাছের মাথায় একখান সাদা থান পরে বসে থাকে। সেই সময় কেউ এই গাছের তলা দিয়ে গেলে, বুড়ী উপর থেকে তার মাথায় মোলায়ম করে হাত বুলে দেয় আর বলে – আয় বাছা, আমার ভিটেয় এসে চারটে পান্তা খেয়ে যা! কেউ যদি একবার তার ডাকে সাড়া দিয়ে বুড়ীর সাথে যায়, তো ব্যাস, তার আর টিকিটি খুঁজে পাওয়া যায় নেকো। নিচ্ছিন্দিপুরের লোক তাই ঠাট্টা করে এই গাছটাকে অমলত্রাস বলে ডাকে!” তিতাস অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো – “তা বুড়ী এত কিছু থাকতে পান্তা খেতে বলে কেন?” বঙ্কু উত্তরে বললো – “সে অনেক কথা, ভিটের দিকে চলো দেখি, পথে যেতে যেতে কইছি।”
তারা দুজনে সেই অলৌকিক মায়াবী গাছটিকে পিছনে ফেলে বঙ্কুর বাড়ীর দিকে রওনা হল। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর বঙ্কু তার গলা খাঁকড়িয়ে পান্তা বুড়ীর গল্প শুরু করলো – “বোঝলে, বুড়ীর আসল নাম ছেল বরোদা সুন্দরী। এই নিচ্ছিন্দিপুরে ছেলে পুলে আর নাতি নিয়ে ছেল তাঁর মেলা সংসার। বুড়ীর নাতি ছেল তাঁর প্রাণভোমরা। সেই নাতির সাথে বসে বুড়ী কাঁসার থালায় করে পান্তাভাত আর মাছভাজা খেত। শুনেছি পোলাটাকে সে নিজে হাতেই খাইয়ে দিত। আর ছেল বুড়ীর নোক খাওয়ানোর শখ। মাঝে মাঝেই গ্রামের লোককে ভিটেয় ডেকে বুড়ী তাদের পেট ভইরে পান্তা আর মাছভাজা খাওয়াতো।
সবই ঠিক চলছিলে, কিন্তু বিধাতা কেন জানি বাধ সাধলে! কঠিন এক ব্যামোতে গ্রামের নোক পটাপট পটল তুলতে লাগলে। গোটা নিচ্ছিন্দিপুরে হাহাকার পড়ে গেল। প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের মানুষ ভিটে ছেড়ে পালাতে লাগলে। বুড়ীর গোটা পরিবার ভয়ে গ্রাম ছাড়লে, কিন্তু একা বুড়ী এই নিচ্ছিন্দিপুরের মায়া ত্যাগ করে যেতে পারলে না। সে ভিটে আঁকড়ে তাঁর নাতির পথ চেয়ে বসে থাকলে – যদি সে পোলা কোনো দিন ফেরত আসে তবে তাকে পান্তাভাত আর মাছভাজা খাওয়াবে বলে! আসলে কি জানো, কাছের মানুষগুলা যখন দূরে চলে যায়, তখন জীবিত মানুষগুলাই কেমন জানি ভূত – পেত্নীর মত হয়ে যায়!”
বঙ্কুর মুখে পান্তা বুড়ীর গল্প শুনে তিতাস কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পেল। আনমনে পথ চলতে চলতে সে বঙ্কুর ভিটেয় এসে পৌঁছালো।
দুপুরবেলা তিতাস খেতে বসেছে, সাথে বঙ্কু, চমকদার পাকড়াশী আর নিদারুণ সোম। তাদের সামনে সাজানো রয়েছে কাঁসার থালা। বঙ্কুদের বাড়ী নিশ্চিন্দিপুরের আর পাঁচটা মাটির কুঁড়েঘরের মত অতিসাধারণ, ঘরে আসবাব প্রায় নেই বললেই চলে। মাটির দেওয়ালের ফাটল দেখে বোঝা যায় যে অনেকদিন যাবৎ তার কোনো মেরামতি হয়নি। বঙ্কুর বাড়ীতে এসে থেকে তিতাসের মনে কোনো কারণে অস্বস্তি হচ্ছে। বঙ্কুর ঠাম্মা তাদের খাবার পরিবেশন করছেন, পদে আছে পান্তাভাত আর বঙ্কুর ধরে আনা মাছ ভাজা, ঠাম্মার পরনে সাদা থান! তিতাসের মনের কোণে হঠাৎ জেগে ওঠা অস্বস্তি ক্রমশঃ বাড়ছে। তার মনের ভিতর একটা সন্দেহ ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে। এক ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা ভেবে তার গায়ে মাঝে মাঝে কাঁটাও দিচ্ছে। তবু সে নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তার পাশে বসা বঙ্কু খাওয়া শুরু করছে না দেখে তিতাস তাকে প্রশ্ন করলো – “কীরে বঙ্কু খাচ্ছিস না যে?” তার ঠাম্মা বলে উঠলেন – “ওমা ও কী কোনোদিন নিজে হাতে খায়! সেই ছোট্ট থেকে তো আমিই দাদুভাইকে খাইয়ে দিই!” এই কথা শুনে তিতাসের গায়ে আবার কাঁটা দিল! সে লক্ষ্য করলো যে বঙ্কুর মত তার ঠাম্মাও নাকিসুরে কথা বলেন। তিতাস যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে সবাইকে বললো – “এবার তবে আসি, নইলে আমার আবার বাড়ী ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।” বঙ্কুর ঠাম্মা বলে উঠলেন – “এসো বাছা! পেট ভইরে খেয়েছ তো? সময় পেলে আবার এসো কিন্তু। তবে রেতের বেলায় এলে আমদের এখেনে পাবে নে, তখন ঐ বাঁশবাগানের পাশে যে অমলত্রাস গাছ আছে সেখেনে যেও!” এই কথা শেষ হতেই তারা সকলে মিলে একসাথে বিশ্রী নাকিসুরে হাসতে লাগলো।
এতক্ষণে তিতাসের সাহসের বাঁধ ভাঙল। সে প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে উঠে প্রাণপণে ছুটতে লাগলো। দৌড়ানোর সময় পিছন থেকে ক্রমাগত সেই হাসির শব্দ তার কানে আসতে লাগলো। কিছুদূর গিয়ে তিতাস বুঝতে পারলো যে তার গোটা শরীর ক্রমে অবশ হয়ে আসছে। দূর থেকে ভেসে আসা হাসির ক্ষীণ শব্দে তার চোখ ধীরে ধীরে বুজে এল। সে আর বেশী দূর যেতে পারলো না, সেই মায়াবী হাসির যাদুস্পর্শে তিতাস পথের ধারেই গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়লো।
ঘুমের মধ্যে তিতাস দেখতে পেল যে এক ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁর পরনে সাদা থান আর তাঁর হাত ধরে আছে একটি ছোট শিশু। তিতাসের মনে হল সেই ছায়ামূর্তি দূর থেকে তাকে কী যেন বলতে চাইছে। আস্তে আস্তে তাঁর কণ্ঠস্বর কাছে আসতে লাগলো। এবার তিতাস স্পষ্ট শুনতে পেল সেই ছায়ামূর্তির কথা – নরম মোলায়ম গলায় সে বলছে – “দিদিভাই, পিঠে খাবি না? তাড়াতাড়ি উপরে চলে আয়!” তিতাস অবাক চোখে দেখলো যে সেই ছায়ামূর্তি আর অন্য কেউ নয়, স্বয়ঃ তার দিদুন আর তাঁর হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট তিতাস! কোথা থেকে একটা পরম প্রাপ্তির মিষ্টি অনুভূতি এসে তিতাসের মনকে ঘিরে ধরলো। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তিতাসের ঘুম ভেঙে গেল।
ঘুম থেকে উঠে তিতাস দেখলো যে সে নিশ্চিন্দিপুরের বাঁশবাগানে শুয়ে আছে। তার আশেপাশে আর অন্য কেউ নেই। আর দেরি না করে সে বাতাসপুরের দিকে রওনা হল। পথে তার চোখে পড়লো সেই মায়াবী গাছ। তিতাস ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলো যে সেই গাছের মাথা থেকে এখন ঝুলছে একটা সাদা থান আর গাছের নীচে পড়ে আছে একটা মাছ ধরার ছিপ!
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে তিতাস পার করে গেল সুপ্তি নদীর উপরের সাঁকো। বাতাসপুরে পৌঁছে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়লো নিজের হাতের মোবাইল ফোনে। মোবাইল ঘেঁটে অতি সহজেই সে খুঁজে পেল নিশ্চিন্দিপুরের বাঁশবাগানে তোলা ছবিটি। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে তিতাস উদ্ধার করলো যে সেই ছবিতে এখন আবছা আলোয় বাঁশগাছের সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে শুধু সে একা!
তিতাস বুঝতে পারলো যে অল্প সময়ের পরিচয়েই যে ছোট্ট বন্ধুটিকে সে কাছে পেয়েছিল, সে আর নেই। কিন্তু সেই বন্ধুর বলা কথাগুলো তিতাসের কানে ক্রমাগত বাজতে লাগলো – “আসলে কি জানো, কাছের মানুষগুলা যখন দূরে চলে যায়, তখন জীবিত মানুষগুলাই কেমন জানি ভূত – পেত্নীর মত হয়ে যায়!” তিতাসের মনে হল আজ সে সত্যি সত্যি এক গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। বাড়ী পৌঁছে সোজা দিদুনের ঘরে গিয়ে তিতাস তাঁকে জড়িয়ে ধরলো। মোক্ষদা বহুবছর পর তাঁর আদরের দিদিভাইয়ের এই আবেগভরা আলিঙ্গনে একেবারে মোমের পুতুলের মত গলে গেলেন। স্নেহভরা কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন – “কি হয়েছে দিদিভাই? সারাদিন কোথায় ছিলি?” তিতাস আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলতে গেল যে সে পিঠে খাবে, কিন্তু তার গলা বুজে এল, পরিবর্তে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়লো – “দিদুন, পান্তা খাব!” এই কথা বলেই সে আবার তার দুহাত দিয়ে দিদুনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো!
**************

