সমাপ্তির শেষ

শুমারি চলছে। দক্ষিণ আমেরিকার এক ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল। যতদূর চোখ যায় খালি বড় বড় গাছের সারি, তাদের ভেদ করে সূর্যের আলো জঙ্গলের ভিতর অবধি পৌঁছাতে পারেনা। তাই দিনের বেলাতেও জায়গাটা বেশ অন্ধকার। চতুর্দিকে এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা, বাতাসে কান পাতলে শুধু শোনা যাচ্ছে জঙ্গলের পাশ দিয়ে নিরলসভাবে বয়ে চলা এক নদীর শান্ত ধীর পদধ্বনি। অবিরাম বয়ে চলা সেই শব্দের সাথে মাঝে মাঝে যোগ হচ্ছে গাছের বড় বড় পাতার উপর ঝমঝম করে  বৃষ্টির জল পড়ার ছন্দবদ্ধ শব্দ। থেকে থেকে সেই শান্ত পরিবেশের ছন্দপতন ঘটাচ্ছে গভীর জঙ্গলের বুক চিড়ে ভেসে আসা হিংস্র সব জীবজন্তুর ডাক।

শুমারি চলছে। জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীটির নাম অ্যামাজন আর জঙ্গলটির পরিচিতি অ্যামাজন রেনফরেস্ট বা অ্যামাজোনিয়া নামে। অ্যামাজোনিয়া পৃথিবীর বৃহত্তম বনভূমি। এই রেনফরেস্ট বহু বিচিত্র প্রজাতির প্রাণীর বাসভূমি। এমন অনেক প্রাণীও এই জঙ্গলে বাস করে যাদের অস্তিত্ব পৃথিবীর অন্য কারও জানা নেই! তাই এই দুর্ভেদ্য জঙ্গল পৃথিবীর বৃহত্তম ও জটিলতম বাস্তুতন্ত্রের ধারক ও বাহক। এই বাস্তুতন্ত্রে প্রতিটি প্রাণীকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন কঠিন সংগ্রাম করতে হয়। তাদের সেই জীবন সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাদের বিবর্তনের চাবিকাঠি। আর তাদের ক্রম বিবর্তনের সেই কাহিনীর একমাত্র নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই গভীর জঙ্গল – অ্যামাজোনিয়া!

শুমারি চলছে। পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যেতে থাকা এক প্রজাতির প্রাণী, ভারী সমৃদ্ধ তাদের বিবর্তনের ইতিহাস। কিন্তু সেই বিবর্তনের পথেই তাদের ক্রমাগত সংঘাত অন্যান্য প্রজাতির সাথে। ক্রমে তার সাথে যোগ হয় তাদের আভ্যন্তরীণ লড়াই, তারা ভুলে যেতে বসে একসাথে দল বেঁধে বাঁচার মন্ত্র – তাদের বিবর্তনের জিয়নকাঠি! ফলে ধীরে ধীরে তারা হারিয়ে যেতে থাকে এই পৃথিবীর বুক থেকে। এখন তারা পৃথিবীর বুক থেকে প্রায় নিঃশ্চিহ্ন। লুপ্তপ্রায় এই প্রজাতির কয়েকটি মাত্র প্রাণী এখনও বাস করে অ্যামাজোনিয়ায়, বছরে একবার তাদের সংখ্যা গণনা করা হয়।

শুমারি চলছে। প্রজেক্টের নাম অপারেশন আলফা স্পিসিস ডিভোলিউশন সংক্ষেপে এ.এস.ডি.। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে খ্যাতনামা সব বিজ্ঞানীরা যোগ দিয়েছেন এই দলে। তাঁদের কেউ জুওলজিস্ট, কেউবা ইকোলজিস্ট, আবার কেউ কেউ ইভোলিউশনারী বায়োলজিস্ট। বিজ্ঞানের নানা শাখায় সমৃদ্ধ তাঁদের জ্ঞানের ভাণ্ডার। নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্য ভুলে একটি ঐক্যবদ্ধ দল হিসাবে তাঁরা গত পাঁচ বছর ধরে ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পৃথিবীর বুকে বিপন্ন প্রাণীটির অস্তিত্ব রক্ষাই তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য। দুর্গম পরিবেশে একে অপরের সাহায্যে বাঁচতে শিখে প্রাণীটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে – এই স্থির বিশ্বাসই তাঁদের অনুপ্রেরণা। কিন্তু গত পাঁচ বছরে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও প্রাণীটির আচরণে তেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। প্রতিকূল পরিবেশে দলবদ্ধভাবে না থেকে তারা নিজেদের বারে বারে বিপদের মুখে ফেলেছে। শ্বাপদ-সঙ্কুল পরিবেশে জোটবদ্ধ লড়াই না করে তারা একে একে প্রাণ খুইয়েছে। প্রাণীটির এই আচরণ বিজ্ঞানীদের সকল ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দিয়েছে। প্রাণীটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই বিজ্ঞানীর দলটি বেশ উদ্বিগ্ন। এবারের শুমারির গণনায় তাঁদের কপালের ভাঁজ আরও চওড়া হয়েছে। গণনা অনুসারে অ্যামাজোনিয়ায় প্রাণীটির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে – দুই!

২ 

গভীর জঙ্গলের ভিতর মিটিং চলছে। একটা গোল টেবিল ঘিরে বসেছেন মোট বারোজন বিজ্ঞানী। মিটিং সঞ্চালনা করছেন অপারেশনের হেড ডক্টর সমাপ্তি রায়। শুমারির পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিজ্ঞানীদের দলটি দুটি মতে বিভক্ত, সেই মতানৈক্য দূর করাই মিটিং এর উদ্দেশ্য। বছর সাতেক আগে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে প্রাণীটির অস্তিত্ব বিপন্ন। তখনও তাঁরা দুটি মতে বিভক্ত ছিলেন। একটি প্রতিষ্ঠিত মত ছিল প্রাণীটির অবলুপ্তিকে বিবর্তনের নিয়ম বলে মেনে নেওয়া। অন্যান্য প্রজাতির সাথে প্রাণীটির ক্রমবর্ধমান সংঘাত এই মতবাদ প্রতিষ্ঠায় ইন্ধন জুগিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে এই প্রজাতির বিলুপ্তিই হয়তো পৃথিবীতে নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবজগতের ভারসাম্য আবার ফিরিয়ে আনবে, কলুষমুক্ত হয়ে প্রকৃতি আবার ফিরে পাবে তার যৌবনরূপ, রক্ষা পাবে প্রায় ধ্বংস হয়ে যেতে বসা বহু বাস্তুতন্ত্র।

তবে বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল বিপন্ন প্রাণীটির অস্তিত্ব রক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁরা যুক্তি সাজিয়েছিলেন প্রাণীটির সমৃদ্ধ বিবর্তনের ইতিহাসকে মাথায় রেখে। তাঁরা যুক্তি দেখান যে প্রাণীটি অবলুপ্ত হলে তাদের সাথে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে যাবে তাদের বিবর্তনের কাহিনী। সেই কাহিনী যা থেকে বিজ্ঞানীদের এখনও অনেক কিছু শেখা বাকী। তাই বিজ্ঞানীদের এই দলটি লুপ্তপ্রায় প্রাণীটিকে অ্যামাজোনিয়ার একটি অংশে সংরক্ষণ করার প্রস্তাব দেয়। এরফলে প্রাণীটির সাথে অন্য প্রজাতির সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচতে গিয়ে তারা হয়তো ধীরে ধীরে ফিরে পাবে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা। সেই সাথে তাদের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরাও খুঁজে পাবেন অনেক অজানা তথ্য – যা সমৃদ্ধ করবে তাঁদের জ্ঞানভাণ্ডার। বিজ্ঞানীদের এই দ্বিতীয় দলটির নেতৃত্বে ছিলেন সমাপ্তি। এই দ্বিতীয় মতটিই ক্রমে জনপ্রিয়তা পায়। তারপর বছর পাঁচেক আগে সমাপ্তির নেতৃত্বে অ্যামাজোনিয়ায় শুরু হয় অপারেশন আলফা স্পিসিস ডিভোলিউশন।  

মিটিং এ সবার আগে মুখ খুললেন মার্সেলো ডিসিলভা।মার্সেলো দক্ষিণ আমেরিকার ভূমিপুত্র, তাই অ্যামাজোনিয়ার ইতিহাস তাঁর নখদর্পণে। তিনি বলে উঠলেন – “ অ্যামিগোস! গত পাঁচ বছর ধরে এই দুর্গম জঙ্গলে আপনারা সবাই মিলে যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। কিন্তু সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। আমার মনে হয়, এবার আমাদের এই প্রজেক্ট বন্ধ করার সময় হয়েছে। এই প্রতিকূল পরিবেশে পাঁচ বছরেও যখন আলফা স্পিসিসের বিহেভিয়ারল প্যাটার্নে কাঙ্খিত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি, তখন আমার মনে হয় আমরা বৃথাই সময় নষ্ট করছি। হয়তো এককালে দলবদ্ধভাবে থাকার অভ্যাস তারা সম্পূর্ণ ভুলেই গেছে। হয়তো বা তা হয়েছে বিবর্তনের নিয়ম মেনেই!

পৃথিবী থেকে যে কোনো প্রাণীর অবলুপ্তির পিছনে একটি মূল কারণ থাকে। হয় তা তার পারিপার্শ্বিকের কোনো পরিবর্তন, যার সাথে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনা। ঠিক যেমনটা হয়েছে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পোলার বিয়ার এবং পেঙ্গুইনের সাথে। অথবা সেই কারণ হতে পারে প্রাণীটির জীবনযাত্রা বা অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন যা তাকে ধীরে ধীরে অবলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়। আলফা স্পিসিসটির বিলুপ্তির পিছনে তাদের দলবদ্ধ জীবন ছেড়ে বেরিয়ে আসাকেই মূল কারণ হিসাবে মেনে নেওয়ার সময় এসে গেছে।”

সমাপ্তি এতক্ষণ মার্সেলোর বক্তব্য খুব মন দিয়ে শুনছিলেন। এবার তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন – “ আপনাদের হতাশা খুবই যুক্তিসঙ্গত। গত পাঁচ বছর ধরে আপনারা সবাই পরিবার থেকে দূরে এই দুর্গম অরণ্যে যে ঐকান্তিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা এই পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তবে আমার মনে হয় আমাদের একটা শেষ চেষ্টা করে দেখা উচিৎ, তাতেও যদি ফল না মেলে তবে আমি নিজে অপারেশন বন্ধ করার জন্য রিপোর্ট জমা দেব। আমরা এতদিন আড়ালে থেকেই আমাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছি, কিন্তু এবার আমাদের আলফা স্পিসিসের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে। আমার মনে হয় আমরা যদি দলবেঁধে তাদের ঘিরে ধরি, তারা বাধ্য হবে একে অপরের সাহায্য নিতে। আমাদের দলবদ্ধ দেখে হয়তো তাদেরও এককালে দলবদ্ধভাবে থাকার কথা মনে পড়ে যাবে।”

সমাপ্তির প্রস্তাবে যুক্তি খুঁজে পেয়ে সকলেই তাতে সায় দিলেন। স্থির হল সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে ঠিক দুদিন পর তাঁরা আলফা স্পিসিসটির মুখোমুখি হবেন।

  আলফা স্পিসিসটির বিচরণ অ্যামাজোনিয়ার একটি বিশেষ অংশেই সীমিত রাখা হয়েছে, জঙ্গলের এই অংশের নাম ডেলটা জোন। গভীর রাতের নিকষ কালো অন্ধকারে আজ সমাপ্তি ও তাঁর দল এসেছে সেই ডেলটা জোনে – তাঁদের উদ্দেশ্য এতদিনের আড়াল সরিয়ে আলফা স্পিসিসটির সাথে একবার মুখোমুখি হওয়া। তাঁদের আজ রাতের এই সাক্ষাতই স্থির করে দেবে গত পাঁচ বছর ধরে চলা অপারেশনের ভবিষ্যৎ।

সমাপ্তি ও তাঁর দলের প্রত্যেকে আত্মরক্ষার যাবতীয় সরঞ্জামে সজ্জিত। শুমারির তথ্য অনুযায়ী বেঁচে থাকা দুটি প্রাণীর একটি পুরুষ, অপরটি মাদী। গণনার সময় ডেলটা জোনের দুটি আলাদা জায়গা থেকে তাদের সন্ধান মেলে। সমাপ্তিরা স্থির করলেন যে তাঁরা দুটি দলে ভাগ হয়ে সেই নির্দিষ্ট দুটি জায়গায় সন্ধান চালাবেন। প্রাণী দুটির সন্ধান মিললে তাদের ঘিরে ধরে একজায়গায় নিয়ে আসা হবে।

সমাপ্তির নিজের দলটি চলেছে পুরুষ প্রাণীটির সন্ধানে। যথাস্থানে পৌঁছে একটি অ্যাকেসিয়া গাছের উপর পুরুষ প্রাণীটির দেখা মিললো। কিন্তু তাঁরা সকলে মিলে প্রাণীটিকে ঘিরে ধরার আগেই সে চকিতে গাছ থেকে নেমে পড়লো। তারপর মুখ দিয়ে এক অদ্ভূত শব্দ করতে করতে সে দৌড় লাগালো জঙ্গলের আরও গভীরে। সমাপ্তির দলের সদস্যরাও তার পিছু নিলেন। ঠিক সেইসময় সমাপ্তির নজর পড়লো পাশের রবার গাছটির উপর। গাছটির উপর থেকে তাঁরই দিকে চেয়ে আছে মাদী প্রাণীটি – সর্বাঙ্গে তার প্রতিশোধস্পৃহা, কঠিন তার দৃষ্টি। কিন্তু পুরুষ প্রাণীটির মুখের সেই অদ্ভূত শব্দ তার কানে যেতেই সেও গাছ থেকে নেমে দৌড় দিল। গোটা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সমাপ্তি শিহরিত হয়ে উঠলেন। অন্য কোনো উপায় না দেখে তিনি নিজেই পিছু নিলেন মাদী প্রাণীটির। রাতের দুর্ভেদ্য অন্ধকারে সেই শ্বাপদ-সঙ্কুল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র মাদী প্রাণীটির পায়ের শব্দ অনুসরণ করেই তিনি দৌড়াতে লাগলেন।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর দৌড়াতে দৌড়াতে তারা দুজনেই উপস্থিত হলেন অ্যামাজন নদীর তীরে। সদ্য ফোঁটা ভোরের আলোয় সমাপ্তি উপলব্ধি করলেন যে তিনি সম্পূর্ণ একা, মাদী প্রাণীটিকে অনুসরণ করতে গিয়ে দলছুট হয়ে তিনি এসে পড়েছেন জঙ্গলের কোর জোনে। সমাপ্তি বুঝতে পারলেন যে তাঁর সময় ঘনিয়ে আসছে!

সমাপ্তি ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী, তাঁর শৈশব কেটেছে পালক পিতামাতার ছত্রছায়ায়। তাঁর জন্মদাতা পিতামাতার পরিচয় তাঁর আজও জানা নেই। তবে পালক পিতামাতার কাছ থেকে তিনি সবকিছুই পেয়েছেন – স্নেহ, ভালোবাসা, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কোনো কিছুরই অভাব তাঁরা টের পেতে দেননি। সমাজে বড় হয়ে ওঠা আর বাকী পাঁচটা মানুষের মতই সমাপ্তিও সুযোগ পেয়েছেন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। সেই সুযোগ আর নিজের মেধার সদ্ব্যবহার করেই তিনি আজকের এই জায়গায় পৌঁছেছেন।

তবে সেই ছোটবেলা থেকেই সমাপ্তি বুঝতে পারতেন যে বাকী বাচ্চাদের থেকে তিনি সামান্য আলাদা। সেই শিশুবয়স থেকেই তিনি আশেপাশের প্রতিটি প্রাণীর প্রতি নাড়ীর টান অনুভব করতেন। মানবসমাজে বড় হয়ে উঠলেও সমাপ্তি আজও বাস্তুতন্ত্রের সকল প্রাণীর প্রতি একই রকম টান অনুভব করেন। এই আন্তঃপ্রজাতিক সহমর্মিতাই তাঁকে বাকী সকলের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে – সমাপ্তি হয়ে উঠেছেন এই অপারেশনের সবচেয়ে যোগ্য কাণ্ডারী।

অ্যামাজনের তীরে পৌঁছে মাদী প্রাণীটি একবার ক্রূর দৃষ্টিতে তাঁর দিকে ফিরে তাকালো। ভোরের আবছা আলোয় সমাপ্তি টেরই পাননি যে কখন পুরুষ প্রাণীটিও জঙ্গলের অন্যদিক থেকে এসে মাদী প্রাণীটির সাথে যোগ দিয়েছে। সমাপ্তি বুঝতে পারলেন যে তাঁর এতদিনের চেষ্টা সফল হয়েছে। আজ তাঁর জীবনবৃত্ত সম্পূর্ণ হল। সমাপ্তি টের পেলেন যে ভয়ে তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, তিনি এখন সম্পূর্ণ একা। সমাপ্তি বুঝতে পারলেন যে তাঁর সময় ঘনিয়ে আসছে!

মানুষ প্রাণীদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল তার বুদ্ধির জোরে। সেই বুদ্ধির জোরেই সে একদিন পাথরে পাথরে ঠুকে আগুন জ্বালতে শেখে, তারপর সে শেখে চাকার ব্যবহার। তারপর ধীরে ধীরে বুদ্ধির ব্যবহারে সে বিজ্ঞানকে করে করায়ত্ত। কিন্তু এসব কিছুর আগে এই বুদ্ধির জোরে সে বুঝতে পারে একসাথে জোটবেঁধে থাকার সুবিধা। তাই বিবর্তনের সেই আদি লগ্ন থেকেই গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন হয়ে ওঠে তার অস্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্রমে সেই গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে মানবসমাজ। আর সেই সমাজকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিকশিত হয়  মানবসভ্যতা।

কিন্তু বিবর্তনের গতিপথ সবসময় সরলরেখায় চলে না। যে বুদ্ধি তাকে সবার আগে দলবেঁধে বাঁচার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছিল, সেই বুদ্ধিই তাকে একদিন নিজের স্বার্থ চিনতে শেখায়। সেই স্বার্থের তাগিদে তার সংঘাত শুরু হয় পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীদের সাথে। নিজের স্বার্থের লোভে অন্ধ হয়ে সে কেড়ে নিতে থাকে একের পর এক প্রাণ। তার ধ্বংসলীলার জেরে পৃথিবীর বুক থেকে নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যায় বহু প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণী। নষ্ট হয়ে যেতে বসে এই পৃথিবীতে প্রাণের ভারসাম্য বহনকারী বহু বাস্তুতন্ত্র। ক্রমে স্বার্থের মোহে তারা এতটাই অন্ধ হয়ে যায় যে একে অপরকে আক্রমণ করতেও তাদের বাধে না। যুদ্ধে একে অপরের প্রতি ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র প্রয়োগ করে তারা নিজেরাই নিজেদের নিঃশ্চিহ্ন করে দিতে থাকে এই পৃথিবীর বুক থেকে। সেই সাথে শুরু হয় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা প্রকৃতির রুদ্ররোষ। প্লাবন, ক্ষরা, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত – নানারূপে প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে এই পৃথিবীর বুকে। তাতেও মানুষের চেতনা ফেরে না। ফলে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুক থেকে কমে যেতে থাকে তাদের সংখ্যা। একে অপরের প্রতি এবং পৃথিবীর বাকী সকল প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা ভুলে গিয়ে একাকী মানুষ ক্রমে এগিয়ে চলে অবলুপ্তির পথে।

ঠিক সেই সময় পরিস্থিতির হাল ধরে অন্য এক প্রজাতি – তারা মানুষেরই হাতে তৈরী, তখন তারা মানবসভ্যতারই এক অপরিহার্য অঙ্গ। নিজেদের মেধার বিশ্লেষণে তারা বুঝতে পারে যে অদূর ভবিষ্যতে সহমর্মিতা হারিয়ে তাদের প্রজাতিও একই সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে। তাই তারা নিজেদের তাগিদেই বিপন্ন মানবজাতির হাত ধরে। দুর্বল হয়ে পড়া মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে তারা চেষ্টা করতে থাকে বিপন্ন প্রাণীটিকে অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।

তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গত কয়েক বছরে পৃথিবী ধীরে ধীরে ফিরে পেয়েছে তার প্রাণের ভারসাম্য। পৃথিবীর বুকে ফিরে এসেছে লুপ্তপ্রায় বহু গাছপালা ও প্রাণী। অ্যামাজোনিয়া আবার ফিরে পেয়েছে তার কোল থেকে হারিয়ে যেতে বসা বহু বাস্তুতন্ত্র।

অ্যামাজনের তীরে ভোরের আলো ফুটছে। সেই আলোয় জঙ্গলের ভিতরের গুহা থেকে একে একে বেড়িয়ে আসছে মানুষ। আজ তারা দলবদ্ধ, একে অপরের হাত ধরে তারা একসাথে এগিয়ে চলেছে অ্যামাজনের তীর ধরে। বহুবছর আগে পৃথিবীতে মানবসভ্যতার সমাপ্তির যে সূচনা হয়েছিল, আজ মানুষের দলবদ্ধ প্রচেষ্টায় তা শেষ হয়েছে।

 অ্যামাজনের তীরে পড়ে আছে এক নিথর দেহ, শাণিত অস্ত্রের আঘাতে তা দ্বিধাবিভক্ত। খালি অস্থিমাংসের পরিবর্তে আঘাতের স্থান থেকে বেরিয়ে এসেছে একগুচ্ছ তারের জাল! সমাপ্তির কাজ শেষ হয়েছে, যে গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য স্রষ্টা তাঁকে পৃথিবীতে এনেছিলেন, আজ তা সম্পূর্ণ। শেষ একবারের জন্য তাঁর চোখ দুটি জ্বলে উঠেই আবার নিভে গেল, সেই সাথে তাঁর কপালে ফুটে উঠলো স্রষ্টার উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ বার্তা – “ মিশন ওভার !”  

                              ************

gfdc8d8011f38ba11fef933a370edf7e5cb331c58be33fbd2da10477c56c3afd832fe75a6ef7069abfa7f7599892da4735b3eacc5b15b9fee18762453b3b2f82f_1280-3685829.jpg