১
রতনবাবু লোকটি এমনিতে খুবই সাধারণ, আশেপাশের আর পাঁচটি লোকের থেকে তাঁকে আলাদা করার তেমন উপায় নেই।তবে অকৃতদার এই মানুষটির ছোটবেলা থেকেই বইপড়ার শখ। তিনি নানা বিষয়ের বই পড়েন ও পড়া হয়ে গেলে সেই বইগুলিকে সযত্নে নিজের সংগ্রহে রেখে দেন। রতনবাবু এক প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর আর্থিক সচ্ছলতা বেড়েছে, আর একইসাথে বেড়েছে তাঁর সংগ্রহে থাকা মূল্যবান বইয়ের সংখ্যা।
কিন্তু ইদানীং তিনি এক মহা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। দুশ্চিন্তার কারণ সংগ্রহে থাকা বইগুলি। এই বইগুলি তাঁর কাছে দুই মলাটের মাঝে বাঁধানো নিছকই কতগুলি জড় পৃষ্ঠা নয়।প্রতিটি বই তার নিজস্বতায় যেন এক একটি জীবন্ত প্রাণ, মলাটের আবরণে থাকা পাতাগুলি যেন বহন করে চলেছে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতির বিবরণ; ঠিক যেন অস্থি-চামড়ার আবরণে থাকা এক একটি মানুষ। বইগুলির সাথে তাঁর আত্মার যোগ তাই বড়ই নিবিড়।
রতনবাবু সেই সকল মানুষদের মধ্যে পড়েন যাদের সমাজ জীবন অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে শূন্য বলে মনে করে।সেই সকল মানুষ যাদের উপস্থিতি কোনকিছুর মুল্যবৃদ্ধি করে না, আবার যাদের সরিয়ে নিলেও পরিস্থিতির কোনও তারতম্য ঘটেনা। এহেন মানুষটির বইপড়ার অভ্যাসটিও বড়ই বিচিত্র। তিনি একই বই একাধিকবার পড়তে ভালবাসেন।প্রথমবারে বইটি তিনি আদ্যোপান্ত পড়েন।পছন্দ হলে বইটির যে অংশগুলি ভাল লেগেছে, সেইগুলিতে দাগ দিয়ে রাখেন বারে বারে পড়ার জন্য।
এই সহজ সরল, স্বল্পতেই সুখী মানুষটি কিছুদিন ধরে বড়ই অসুখী হয়ে পড়েছেন এই কথা ভেবে যে তাঁর অবর্তমানে সঙ্গে থাকা বইগুলির কি হবে? কৃত্রিম মেধার অগ্রগতির এই যুগে বইয়ের জন্য উপযুক্ত লাইব্রেরী পাওয়া দুষ্কর। যদিবা দু একটি লাইব্রেরীর সন্ধান মেলে, তাদের সাথে কথা বলার পর রতনবাবুর মন সায় দেয় না। তিনি বুঝতে পারেন যে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা এই লাইব্রেরীগুলিরও ইন্টারনেট ক্যাফেতে রুপান্তরিত হয়ে যাওয়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা।তাঁর সমস্যার সমাধান তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। অথচ তাঁর জীবদ্দশাতেই পরম আদরের বইগুলির যথোপযুক্ত ব্যাবস্থা করে যেতে তিনি বদ্ধপরিকর।
২
কিছু সুরাহা করতে না পেরে রতনবাবু স্থির করলেন যে তাঁর সমস্যার কথা তিনি তাঁর বাল্যবন্ধু সম্রাটকে খুলে বলবেন। সম্রাট পেশায় বৈজ্ঞানিক, তাই তাঁর মাথায় অভিনব চিন্তাভাবনার খামতি নেই, সেই হয়তো পারবে উপযুক্ত উপায় বের করতে। অতীতে বহুবার সমস্যায় পড়ে তিনি সম্রাটের দ্বারস্থ হয়েছেন, কোনোবারই সম্রাট তাঁকে হতাশ করেননি। হাজার হোক, সম্রাট তাঁর ছোটবেলার বন্ধু, তাই ভেবেচিন্তে তিনি যে সমাধান বের করেন তা মানুষ হিসাবে তিনি রতনবাবুকে যতটা চেনেন্ সেই অভিজ্ঞতা থেকেই। ফলে রতনবাবুরও সেই উপায় মেনে নিতে আপত্তি থাকে না।
অতঃপর এক রবিবারের সন্ধ্যায় রতনবাবু হাজির হলেন সম্রাটের বাড়ীতে। সম্রাট তো তাঁর বাল্যবন্ধুকে পেয়ে বেজায় খুশী। কিছুক্ষণ খোশগল্প করার পর, রতনবাবু তাঁর চিন্তার কথা সম্রাটকে খুলে বললেন। সবশুনে সম্রাট খানিকক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবলেন, তারপর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসি হেসে বললেন – “ এই নিয়ে বেশী চিন্তা করিস না। আচ্ছা তুই কি এখনও রেডিও শুনিস?”
সম্রাটের প্রশ্ন শুনে রতনবাবু স্মৃতির সরণীতে অনেকখানি পিছিয়ে গেলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল শৈশবের সেইসব নির্জন দুপুরের কথা, যখন বাড়ীর বড়রা নিশ্চিন্তে ভাতঘুম দিলে, তিনি আর সম্রাট মিলে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে রেডিও শুনতেন। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা্, রেডিওর নব ঘোরালেই কখনও শোনা যেত খেলার ধারা বিবরণী, কখনও বা ভেসে আসতো অনুরোধের গান, কখনও বা জানা যেত দেশবিদেশের কত অজানা খবর। নানা তরঙ্গের সেইসব শব্দরাশি অলস দুপুরের নিশব্দতার সাথে মিলেমিশে যেন এক অপূর্ব মায়াজাল রচনা করতো। রেডিওর নব ঘুরিয়েই দুই রোমাঞ্চিত শিশুমন ভিন্ন স্থান আর পাত্রের নাগাল পেয়ে যেত।
এই রেডিও শুনতে শুনতেই রতনবাবুর একজন ধৈর্যবান শ্রোতা হয়ে ওঠা। এখনও তিনি কথা কমই বলেন, আর অন্যের কথা শোনার চেষ্টা করেন মন দিয়ে; পরে যা কিছু শুনলেন, যা কিছু দেখলেন, মনের গভীরে সেগুলি রোমন্থন করেন উপলব্ধি বাড়াতে।
দেওয়াল ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা বাজার শব্দে রতনবাবু তাঁর চিন্তার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলেন। সম্রাটের প্রশ্নের জবাবে তিনি হেসে বললেন – “ না ভাই, আজকাল আর আগের মত নিয়ম করে শোনা হয় না। আসলে বাড়ীর রেডিওটা অনেকদিন হল বিগড়েছে, সময়ের অভাবে আর সারানো হয়নি।” উত্তর শুনে সম্রাট তাঁকে বসতে বলে কিছুক্ষণের জন্য ভিতরের ঘরে গেলেন, যখন ফিরলেন তখন তাঁর হাতে একটি ছোট রেডিও। সেটি তাঁর বাল্যবন্ধুর হাতে দিয়ে তিনি বললেন – “মনে পড়ে? এটা তুই বাড়ী নিয়ে যা, রেডিও শুনলে তোর মন ভাল হয়ে যাবে, আশা করি তোর দুশ্চিন্তাও দূর হবে।” রতনবাবু নিজেও যে কিছুক্ষণ আগে শৈশবে ফিরে গিয়েছিলেন, বন্ধুর কাছে সে কথা আর উল্লেখ করলেন না। শুধু বললেন – “আজ তবে উঠি, পরের রবিবার না হয় একবার দেখা করা যাবে।” বন্ধুকে দরজার কাছে ছাড়তে এসে সম্রাট বললেন – “রেডিওটা কিন্তু অনেকদিনের, নবটা একটু আলগা হয়ে গেছে, খুলে গেলে বিপদ, সাবধানে ব্যবহার করিস।” রতনবাবু তাঁর বাল্যবন্ধুকে আশ্বস্ত করে সেখান থেকে বিদায় নিলেন।
ফেরার পথে রতনবাবু অনুভব করলেন যে বাল্যবন্ধুর সাক্ষাতে দুশ্চিন্তার মেঘ সাময়িকভাবে কেটে গেলেও একাকী পথ চলার সময় আবার তা ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। অতীতে তাঁর সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়া বন্ধুটিও যে এবার কোনো উপায় বাতলে দিতে পারলো না, তা ভেবে তিনি একপ্রকার হতাশই হলেন। মনে মনে ভাবলেন যে চিন্তাভাবনা করার জন্য সম্রাটের হয়তো আরও সময়ের প্রয়োজন, পরের রবিবার তাঁর বাড়ী গেলে নিশ্চয়ই একটা সমাধান পাওয়া যাবে।
৩
বাড়ী ফিরে ডিনার সেরে শুতে যাওয়ার আগে রতনবাবু তাঁর বাল্যবন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া রেডিওটি শুনতে বসলেন। সম্রাটের হাত থেকে নেওয়ার সময় তিনি ভাল করে লক্ষ্য করেননি, এখন দেখলেন যে সত্যি রেডিওটির নব ঘাঁট থেকে সামান্য আলগা হয়ে বেরিয়ে আছে। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে রেডিওটি তাঁর জীবনে দেখা বাকী সব রেডিওর থেকে সামান্য আলাদা। তিনি দেখলেন যে রেডিওতে বেতার তরঙ্গের স্কেলটি উপর নীচে তিনটি সারিতে বিন্যস্ত, উপরেরটি ০-১০০(প্রতিটির মাঝে ১০ এর অন্তর), মাঝেরটি ১০০-১০০০(প্রতিটির মাঝে ১০০ এর অন্তর), আর একেবারে নীচেরটি ১০০০-১০০০০(প্রতিটির মাঝে ১০০০ এর অন্তর)। রেডিও টিউন করার নবটির তিনটি ঘাঁট আছে, এক একটি ঘাঁট স্কেলের এক একটি সারিকে নির্দেশ করছে। নবটি আলগা হওয়ায় সেটিকে উপর নীচে ঠেলে ইচ্ছামত এক ঘাঁট থেকে অন্যটিতে যাওয়া যায়। নবটিকে যে কোনো একটি ঘাঁটে রেখে ঘোরালেই স্কেলের সেই সারির বেতার তরঙ্গ শোনা যায়।
রতনবাবু রেডিওর নব ঘুরিয়ে একেবারে উপরের সারির (০-১০০) বেতার তরঙ্গ শোনার চেষ্টা করতে লাগলেন। খানিকক্ষণ চেষ্টা করার পর তাঁর কানে ভেসে এল কলেজ জীবনের এক প্রিয় গান। কিন্তু এ কি? সেই গান তো তাঁর রেডিও থেকে বাজছে না। তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন, শোওয়ার ঘরের জানালার পর্দা সরাতেই, প্রথমে তাঁর চোখ পড়ল বাড়ীর উল্টোদিকের পলাশ গাছটিতে। বসন্তের ছোঁয়ায় সে যেন তার সর্বাঙ্গ আবিরে রাঙিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটির পিছনের মাঠে কারা যেন বসে গল্প করছে। বসন্তের হালকা বাতাসের স্পর্শে রতনবাবুর চোখের সামনে ভেসে উঠল ঐ পলাশ গাছ আর খেলার মাঠ ঘিরে শৈশবের নানা স্মৃতি।
হাওয়ার রেশ কমে যেতেই রতনবাবু তাঁর সম্বিৎ ফিরে পেলেন।আরে এ তিনি কি দেখছেন? এই পলাশ গাছটি তো প্রায় তিরিশ বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছিল, খেলার মাঠও তো আর থাকার কথা নয়। এই দুইয়ের জায়গায় যে গজিয়ে উঠেছিল এক প্রকাণ্ড অট্টালিকা! সেও প্রায় তিরিশ বছর আগের ঘটনা। রাস্তার অপর প্রান্তে তাকাতেই তাঁর চোখে পড়ল একটি পানের দোকান, গানের শব্দ ভেসে আসছে সেই দোকান থেকেই, আর দোকানে বসে গানের তালে তালে বিড়ি বেঁধে চলেছেন বছর তিরিশ আগে ইহলোক ত্যাগ করে চলে যাওয়া সেই দোকানের মালিক!
রতনবাবুর সব কিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তিনি যা কিছু দেখছেন সবই যে অতীতের! তিনি কি তবে ঘোরের মধ্যে আছেন? নাকি কোনোভাবে সত্যি এসে পড়েছেন অতীতে। হঠাৎ করে তাঁর মাথায় বিদ্যুতের চমকের মত এক চিন্তা খেলে গেল, তিনি ফিরে এলেন রেডিওর কাছে। আর বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখলেন যে নব ঘুরিয়ে বেতার তরঙ্গের স্কেলে যে জায়গায় তিনি পৌঁছেছিলেন তার সংখ্যাও ৩০!
রতনবাবুর শরীরের ভিতর দিয়ে উত্তেজনার এক চোরা স্রোত বয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন যে বাল্যবন্ধুর দেওয়া রেডিওটির নব ঘুরিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন সময়ের এক অন্য পরিসরে। রেডিওর নব আর স্কেলের সংখ্যাগুলির দিকে তাকিয়ে মনে মনে যে অসীম সম্ভাবনার হদিস তিনি পেলেন, তা তাঁর সমস্ত শরীরকে শিহরিত করে তুললো।
আজ বহুদিন পর রতনবাবু আবার তাঁর শৈশবের রোমাঞ্চ ফিরে পেয়েছেন, শিশুমনের সেই রোমাঞ্চকে সম্বল করেই তিনি যাত্রা করলেন সময়ের সরণীতে!
৪
আজ রবিবার। রতনবাবু এসেছিলেন তাঁর বন্ধু সম্রাটের বাড়ী তাঁর দেওয়া রেডিওটি ফেরত দিতে। কিন্তু সম্রাট না থাকায় তাঁর বিশ্বস্ত কাজের লোক রঘুকে জানিয়ে বেডরুমের টেবিলের উপর রেখে এলেন রেডিওটি, সাথে একটি ছোট রঙিন খাম।
বাড়ী ফেরার পথে রতনবাবু অনুভব করলেন যে আজ তিনি সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত।সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়ে তিনি মন থেকে খুব হালকা বোধ করছেন। আর এই সমাধান যে তাঁর বাল্যবন্ধুরই কল্যাণে তা উপলব্ধি করে তাঁর মন প্রসন্নতায় ভরে উঠলো। আজ অনেকদিন পর আবার তিনি শান্তিতে বই পড়তে পারবেন, এই কথা ভেবে উৎফুল্ল মনে তিনি তাঁর বাড়ীর দিকে রওনা হলেন।
সম্রাট বাড়ী ফিরে টেবিলের উপর রেডিওটি দেখে বুঝতে পারলেন যে তাঁর বন্ধু এসেছিলেন দেখা করতে।তাঁর নজর পড়ল রেডিওর পাশে রাখা রঙিন খামটির উপর।তার ভিতর হাত চালিয়ে তিনি পেলেন একটুকরো কাগজ, আর তাতে বন্ধুর হাতে লেখা কয়েকটি লাইন – “ ভাই সম্রাট, অসংখ্য ধন্যবাদ! আমি সমাধান খুঁজে পেয়েছি। আমার অবর্তমানে বইগুলির দায়িত্ব আমার শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুটিকেই দিয়ে গেলাম।শুনেছি এক প্রাচীন সভ্যতায়, মৃত্যুর পর সম্রাটদের প্রিয় বস্তুগুলি তাঁদের সমাধির ভিতর রেখে দেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল, তাঁরা বিশ্বাস করতো যে মানুষের মৃত্যুর পরও আত্মার সাথে তাঁর প্রিয় বস্তুগুলির নিবিড় সম্পর্ক অক্ষুন্ন থাকে। ভেবে দেখলাম যে বইগুলির সাথে আমার সম্পর্কও ততটাই নিবিড়! খামের ভিতর একটা ছোট শিশি রেখে গেলাম। এই শিশির ভিতরের তরল সেই সময় ব্যবহার করা হত সমাধির ভিতর মুল্যাবান জিনিষগুলিকে ঠিক রাখার জন্য!”
চিঠি শেষ করে সম্রাট আবিষ্কার করলেন যে সত্যি খামের ভিতর রাখা রয়েছে একটি ছোট্ট শিশি, তার গায়ের অপূর্ব নকশা যেন উঠে এসেছে ইতিহাসের বইয়েরই কোনো পাতা থেকে, আর শিশির ভিতর থেকে উঁকি মারছে এক অপার্থিব তরল পদার্থ!
***************

