১
বনলতা কলেজে বোটানি পড়ান। শিক্ষিকা হিসাবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি খুবই জনপ্রিয়।এই জনপ্রিয়তার মূল কারণ এই যে তিনি সকল ছাত্রছাত্রীকেই সমান চোখে দেখেন। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যেমন তাঁর প্রিয়, অপেক্ষাকৃত কম মেধার ছাত্রছাত্রীদের প্রতিও তিনি তেমনি যত্নশীল। আসলে তাঁর মনে হয় যে এক মাটি পেলেও সব গাছ যেমন সমান বাড়ে না, তেমনি একই পরিবেশে প্রতিটি মানুষও জীবনে একই উচ্চতায় পৌঁছায় না।এটাই প্রকৃতির নিয়ম, আর সেই নিয়ম মেনে নিয়েই তিনি অধ্যাপনা করেন।বাগানের সব গাছ সমান না হলেও মালী তাদের কেটে ছেঁটে, পরিচর্যা করে দেখতে সুন্দর করে তোলে। বনলতাও চেষ্টা করেন প্রত্যেক ছাত্রছাত্রী যাতে একে অপরের থেকে আলাদা হয়েও নিজেকে সুন্দরভাবে মেলে ধরতে পারে।
রোজকার মত কলেজ সেরে বনলতা তাঁর বাড়ী ফিরলেন।স্বামী আর একমাত্র ছেলে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। বনলতার স্বামী কিশলয় তাঁরই কলেজের সহপাঠী।কলেজে পড়তেই তাঁদের প্রথম দেখা, প্রেম এবং পরে শুভ পরিণয়। সেই সময় তাঁদের দেখলে মনে হত যেন একই ডালের দুটি কচি সবুজ পাতা। সময়ের সাথে সাথে তাঁদের সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে। আজ তাঁদের দেখে মনে হয় একই ডালে পাশাপাশি ফুটে থাকা দুটি বড় গোলাপ, যারা নিজেদের ভারে ক্রমশ একে অপরের বিপরীত দিকে নুইয়ে পড়ছে, কিন্তু কোন এক অদৃশ্য সুতো সাত পাকে বেঁধে রাখায় তারা কেউই ডাল থেকে খসে পড়ছে না।
কিশলয় প্রায় দুমাস হল জীবিকাহীন। একসময় তিনি খুব বড় এক প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করতেন। তখন বনলতাদের সংসারেও সচ্ছলতা ছিল। তারপর কপালের ফেরে একদিন তিনি চাকরী হারালেন। সেইসময় থেকে একটা ভাল চাকরীর জন্য তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে দু একটি ছোট ফার্মে তিনি কাজও পেয়েছেন, কিন্তু তাদের কোনটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে তাঁর নিজেরদিক থেকে চেষ্টার কোন খামতি তিনি রাখেননি। কিশলয়ের অবস্থা অনেকটা সেই অর্কিডের মত যার জীবনচক্রে প্রথমে নতুন শিকড় গজায়, তারপর নতুন পাতা আসে, নতুন ফুলও ফোটে। কিন্তু সেই ফুল সে বেশীদিন ধরে রাখতে পারেনা। ক্রমে তার সব ফুল ঝরে যায়। তখন সে আবার গোড়ার দিক থেকে শুরু করে নতুন শিকড়ের সন্ধানে। তার গোটা জীবনটাই এক ভাঙাগড়ার চক্রে আবদ্ধ থেকে যায়। বাড়ী ফিরে বনলতা দেখলেন যে রোজকার মত কিশলয় চেয়ারে বসে, পুরানো খবরের কাগজের বান্ডিল নিয়ে নতুন চাকরীর খোঁজ করে চলেছেন।
২
শোওয়ার ঘরে উঁকি মেরে বনলতা দেখলেন যে তাঁর ছেলে অর্জুন তখনও বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে। অর্জুনের বয়স তেরো, সে ক্লাস সেভেনে পরে। একমাত্র ছেলের প্রতি বনলতার অগাধ ভালবাসা, তাঁর আশা বড় হয়ে অর্জুন তাঁর অনেক প্রত্যাশাই পূরণ করবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন যে তাঁর ছেলে একদিন মহীরুহ হয়ে সমাজের বুকে তার ডালপালা মেলে ধরবে, সেদিন তার ডালপালার ছায়ায় অন্য অনেক মানুষের সাথে তিনি নিজেও আশ্রয় নেবেন।
অর্জুনের লেখাপড়ার দিকে বনলতার কড়া নজর। তিনি বিশ্বাস করেন যে লেখাপড়াই মানুষের মনের ভিত গড়ে দেয়। সেই ভিত যত মজবুত হয়, ততসহজেই সে নিজেকে চারদিকে মেলে ধরতে পারে। তিনি মনে প্রাণে চান যে অর্জুনের ভিতও যেন শক্তপোক্ত হয়। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তিনি লক্ষ্য করছেন যে তাঁর ছেলের লেখাপড়ার থেকে আর্টের কাজে আগ্রহ অনেক বেশি। ছোট থেকেই সে খুব সুন্দর ছবি আঁকে, তার সাথে ইদানিং যোগ হয়েছে মাটি দিয়ে নানা জিনিস বানিয়ে, রঙ করে তাদের জীবন্ত করে তোলার খেলা। অর্জুনের হাতের ছোঁয়ায় মাটির জিনিসগুলি যেন সত্যি প্রাণ পায়! তাঁর ছেলের আর্টের প্রতি এই আগ্রহ একেবারে অপছন্দ না হলেও বনলতা স্পষ্টই বুঝতে পারছেন যে অর্জুন তার লেখাপড়ায় আর আগের মত সময় দিতে পারছে না। তিনি বেশ কয়েকবার ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু বিশেষ লাভ হয়নি। কাল অর্জুনের ক্লাস সেভেন এর রেজাল্ট, সে কথা মনে পড়তেই বনলতার মনের ভিতর এক দীর্ঘশ্বাস পড়লো, শোওয়ার ঘর ছেড়ে তিনি এগিয়ে গেলেন বাড়ীর বাগানের দিকে।
বাড়ীর বাগানটি বনলতার সবথেকে প্রিয় জায়গা। তিনি নিজেই বাগানের সব গাছের পরিচর্যা করেন। ছোটবেলা থেকেই গাছেদের সাথে বনলতার পরম বন্ধুত্ব। উপকারী কিন্তু সদা নির্বাক এই প্রাণীগুলির মাঝে সময় কাটিয়ে তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও জীবনের চাওয়া-পাওয়ার সকল হিসাব ভুলে এক পরম শান্তিলাভ করেন। ক্ষণিকের এই নির্মল শান্তি বনলতার মনের দৈনন্দিন শ্রান্তি অনেকটাই লাঘব করে দেয়। তাই কলেজ থেকে বাড়ী ফিরে তিনি প্রায় প্রতিদিনই একবার করে তাঁর বাগানে আসেন।
বনলতার বাগানে হরেক রকমের গাছ। তাদের ফুলের রঙ, পাতার গঠন, আকার ও স্বভাবের বৈচিত্র্য দেখে মনে হয় ঠিক যেন এক মানবসমাজ! সে বাগানে আছে ফিটোনিয়া বা নার্ভ প্লান্ট, তার ছোট ছোট পাতায় অপূর্ব নকশা, দূর থেকে দেখলে মনে হয় ঠিক যেন মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র! কিন্তু সে গাছ বড় নাটুকে, পরিচর্যার সামান্য অভাবেই সে নেতিয়ে পড়ে তার মনের ক্ষোভ উগড়ে দেয়। আবার পুরানো যত্ন ফিরে পেলেই নিজের পাতাগুলি মেলে ধরে জানান দেয় যে সে খুশী, ঠিক যেন পরিবারের এক আবেগপ্রবণ মানুষ। আর আছে আন্থুরিয়াম, তার ফুল আর পাতার গঠন এমনি যে দেখলে মনে হয় সবসময়ই সে যেন নির্লজ্জের মত সবাইকে ভালবাসা জানাচ্ছে! তবে সে বরাবরই বড় গাছের ছত্রছায়ায় থাকতে পছন্দ করে। স্তাবক মানুষ পছন্দ না হলেও এই গাছটি কিন্তু বনলতার ভীষণ প্রিয়! তবে সব থেকে নজর কাড়ে বাগানবিলাস, সে এক রঙিন চরিত্র! নানা রঙের ফুলে সেজে সে সর্বদাই তৈরি নিজের খুশীর জানান দিতে। তার অভিযোগ কম, অল্প যত্নেই সে সুখী। জল কম পেলে সেও কষ্ট পায়, কিন্তু তার কষ্ট সে প্রকাশ করে আরও বেশী ফুল ফুটিয়ে। একজন উদার মনের মানুষের মতই সে সকলকে কাছে টানে। বাগানে প্রাণের বৈচিত্র্যের এই সমাহারে বনলতার মন খুশীতে ভরে উঠে।
তবে সকল পাওয়ার মাঝে যেমন কিছু না পাওয়া থাকে, বনলতার মনেও তেমনি তাঁর বাগান নিয়ে এক আক্ষেপ আছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ইচ্ছা যে তিনি বাগানে বনসাই করবেন। কিন্তু বহুচেষ্টা করেও বনসাইয়ের উপযুক্ত গাছ তিনি জোগাড় করে উঠতে পারছেন না।
৩
বনসাই করার জন্য এমন গাছ লাগে যার গুঁড়ি মোটা, পাতা আকারে ছোট এবং যার পাতা বা ডালপালা ছেঁটে দিলে তা আবার দ্রুত গজিয়ে যায়। এই সকল বৈশিষ্ট থাকলে তবেই গাছটির ছোট অবস্থা থেকে শিকড়, ডালপালা ও পাতাগুলিকে সুপরিকল্পিতভাবে ছেঁটে সেটিকে বিভিন্ন আকার দেওয়া যায়। ক্রমাগত পরিচর্যার ফলে, বাগানের স্বল্প জায়গাতেই বনসাইয়ের গাছটি একটি পূর্ণ অবয়ব গাছের ছোট প্রতিকৃতি হয়ে ওঠে।
বনলতা এখনও তাঁর বনসাইয়ের জন্য উপযুক্ত গাছের খোঁজ করে চলেছেন। বাগানে ঘুরতে ঘুরতে শোওয়ার ঘর থেকে ছেলের ডাক শুনতে পেয়ে তিনি সেদিকে ফিরে তাকালেন। অর্জুন উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল – “ মা, মনে আছে তো? কাল কিন্তু আমার রেজাল্ট! আর্টের ক্লাসে বানানো জিনিসটা সবার কেমন লেগেছে, তা কালই জানা যাবে।” ছেলের কথা শুনে বনলতা বুঝলেন যে আর্টের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তাঁর ছেলের যতটা উদ্বেগ বা উচ্ছাস, বাকী বিষয়গুলি নিয়ে তার বিন্দুমাত্র নেই। আর্টের পরীক্ষায় এবার ক্লাসে সে নিজের হাতে একেবারে নিজস্ব এক জিনিস বানিয়ে জমা করেছে, যা নিয়ে সে নিজে খুবই রোমাঞ্চিত। বনলতা তার চাপা উত্তেজনা বুঝতে পেরে বললেন – “ হ্যাঁ, তার সাথে বাকী বিষয়গুলিতে তুমি কেমন করলে তাও জানা যাবে।” মায়ের কথার লুকানো শ্লেষ বুঝতে পেরে, অর্জুন চুপ করে রইল। বনলতা অনুভব করলেন যে তিনি আবার সেই চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ছেন, বাগান থেকে বেড়িয়ে তিনি তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢুকে পড়লেন।
পরেরদিন ছেলের রেজাল্টের চিন্তায় বনলতা ঠিক করে ক্লাস নিতে পারলেন না। প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ আগেই কলেজ থেকে বেড়িয়ে পড়লেন। বাড়ী ফিরে দেখলেন যে তাঁর স্বামী নিরুত্তাপ, প্রতিদিনের মত চেয়ারে বসে তিনি একমনে খবরের কাগজ দেখে চলেছেন। শোওয়ার ঘরে গিয়ে বনলতা দেখলেন যে অর্জুন সেখানে নেই, তার পড়ার টেবিলের উপর পড়ে আছে পরীক্ষার মার্কশিট। বনলতা মার্কশিট খুলে দেখলেন যে তাঁর আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে! প্রায় প্রতিটি বিষয়েই তাঁর ছেলের অবনতি হয়েছে, কয়েকটা বিষয়ে তো সে প্রায় ফেল করতে করতে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। রেজাল্ট দেখে বনলতা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। ছেলেকে খুঁজতে যাবেন এমন সময় দেখলেন যে অর্জুন নিজেই বাগানের দিক থেকে হাসিমুখে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। ছেলের মুখে গ্লানির চিহ্নমাত্র খুঁজে না পেয়ে তাঁর রাগ বহুগুণ বেড়ে গেল। অর্জুন তাঁকে কিছু একটা বলতে চাইছিল, কিন্তু আর কোনো কিছু শোনারই ধৈর্য তাঁর রইলো না!
আজ সারাদিন ধরে মনে মনে অনেক কথাই ভেবে রেখেছিলেন ছেলেকে বোঝাবেন বলে, কিন্তু এখন প্রচণ্ড ক্রোধে সেইসব কিছুই আর মাথায় এলনা, রাগে গর্জে উঠে ছেলেকে খালি বললেন – “ আজ থেকে তোমার আর্টের সমস্ত কাজ বন্ধ”। মার কথা শুনে হঠাৎ বাণবিদ্ধ পাখীর মত অর্জুন মাটিতে বসে পড়লো। সে তার এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনে কোনো দিনই মায়ের কোনো কথার প্রতিবাদ করেনি, আজও এই রায় সে মাথা নীচু করে মেনে নিল, শুধু তার মনের আকাশে ঘনিয়ে এল হতাশার কালো মেঘ।
৪
বনলতার বাড়ীতে আজ অরন্ধন, প্রচণ্ড রাগে জ্ঞান হারিয়ে তিনি নিজেকে একটি ঘরে আটকে রেখেছিলেন।গভীর রাতে তাঁর চেতনা ফিরল। শোওয়ার ঘরে গিয়ে দেখলেন যে অর্জুন না খেয়েই শুয়ে পড়েছে। তার মার্কশিট তখনও পড়ার টেবিলে রাখা। সেটিকে স্কুলের ব্যাগে রাখতে গিয়ে বনলতা খুঁজে পেলেন একটি গোল্ড মেডেল আর একটি শংসাপত্র, অর্জুনের আর্টের কাজের প্রথম স্বীকৃতি! নিজের অজান্তেই বনলতার চোখ ছলছল করে উঠলো। তাঁর মনে প্রবল দ্বন্ধের যে ঝড় বইছে তা শান্ত করতে বনলতা তাঁর প্রিয় বাগানে চলে এলেন, রোজকার মত আজ আর এদিকটায় তাঁর আসা হয় নি।
গাছেদের মাঝে কিছুটা সময় কাটিয়ে তিনি মনের শান্তি ফিরে পেলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি হঠাৎই আবিষ্কার করলেন যে তাঁর বাগানে আগমন হয়েছে এক নতুন সদস্যের – সে তাঁর ছেলের হাতে মাটি দিয়ে গড়া কিন্তু একেবারে জীবন্ত একটি অর্জুন গাছের বনসাই!
বনলতা বাগান থেকে শোওয়ার ঘরে ফিরে এলেন। বিছানায় শুয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে তাঁর মন আনন্দে ভরে উঠলো। এখন আর তাঁর মনে কোনো দ্বন্ধ নেই, বনসাই করার উপযুক্ত গাছ তিনি এতদিনে খুঁজে পেয়েছেন! ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার স্বপ্ন চোখে মেখে বনলতা ঘুমোতে গেলেন।
****************

