১
“আয় ভটকাই, তোকে ধরে চটকাই!” রাঙা মেসোর বাজখাঁই গলায় কথাগুলো শুনে ভটকাইয়ের দুই কান লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। ভটকাইয়ের ভাল নাম ইমন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বাড়ীর লোকজন, আত্মীয়স্বজন তাকে তার ডাকনাম ধরে ডাকতেই বেশী পছন্দ করে। কম বয়সে সে কোনো আপত্তি করেনি, কিন্তু এখন সে বড় হয়েছে, গোবর্ধনপুর হাইস্কুলে ক্লাস নাইনের ছাত্র সে, তার ঠোঁটের উপর গোঁফের হালকা রেখাও দেখা দিয়েছে!এই অবস্থায় ডাকনামটি তার কাছে ক্রমেই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠছে। বন্ধুরাও পান থেকে চুন খসলেই তার ডাকনাম নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি করে।
আজ রবিবার। রাঙা মেসো আর মাসি এসেছেন ইমনদের বাড়ীতে। তাদের বাড়ীতে কোনো আত্মীয়স্বজন এলেই ইমনের ডাক পড়ে গান শোনানোর জন্য। আসলে ইমনের গানের গলাটি ভারী সুরেলা। ছোটবেলায় ভাল করে কথা বলতে শেখার আগে থেকেই সে টিভি বা রেডিওতে গান শুনে তার সাথে গুনগুন করে গলা মেলাত। গানে প্রতিভার হদিস পেয়ে তার বড় জ্যেঠা মাত্র ছবছর বয়সেই তাকে গানের ক্লাসে ভর্তি করে দেন।বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইমনের প্রতিভার বিকাশ ঘটেছে। এখন সে তার তানপুরা নিয়ে প্রতিদিন পুরোদস্তুর রেওয়াজ করে। পাড়ার পূজোয় বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার গান তো একেবারে বাঁধাধরা।
রাঙা মেসো মানুষটি খুবই আমুদে।তিনি এলেই বাড়ীর মধ্যে একটা হৈহৈ পড়ে যায়। ছোট বড় নির্বিশেষে বাড়ীর সকলের সাথেই তাঁর হাসিঠাট্টার সম্পর্ক, ইমনও সেই তালিকা থেকে বাদ যায় না। তবে ইমনকে তিনি ছোটবেলা থেকেই খুব স্নেহ করেন। মেসোর কথা শুনে রাঙামাসি তাঁকে এক ধমক দিয়ে বললেন – “আহ, তোমরা সবাই মিলে ওর পিছনে বড্ড লাগো, ছেলেটা বড় হয়ে গেছে না!” তারপর তিনি ইমনের দিকে ফিরে বললেন – “ তুই ওঁর কথায় কান দিসনা তো! তুই বরং আজ একটা রাগাশ্রয়ী গান শোনা। মেঘমল্লার জানা আছে? গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জেরে মাঝ আষাঢ়েও বর্ষার যা করুণ দশা! তবু তোর গান শুনে যদি বৃষ্টি নামে!” ইমনের মেঘমল্লার রাগের উপর একটাই গান জানা ছিল, সে ঠিক করলো সেই গানটাই সে শোনাবে। তার সাধের তানপুরাটা কানে লাগিয়ে ইমন গান শুরু করলো।
গান গাইতে শুরু করলেই ইমন এক অন্য জগতে পৌঁছে যায়। সেখানে অন্য কেউ নেই, খালি সে আর তার সাত সুর। তারা সকলে মিলে একসাথে যেন মেঘের ভেলায় করে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভেসে বেড়ায়। তাদের এই একসাথে ভেসে বেড়ানোর আনন্দ উপস্থিত শ্রোতারাও টের পান। তাঁরাও তখন সেই আনন্দঘন অভিজ্ঞতায় সামিল হয়ে মুগ্ধ হয়ে যান।
ইমন আজ মেঘমল্লার রাগের উপর একটি গান গাইছে। প্রতিটি রাগে কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভাগ থাকে – আরোহণ অর্থাৎ নিচের সুর থেকে শুরু করে ক্রমে উঁচু সুরে পৌঁছানো, অবরোহণ অর্থাৎ উঁচু সুর থেকে শুরু করে নিচের সুরে যাওয়া, বাদী অর্থাৎ রাগের প্রধান সুর যা ব্যবহৃত হয় রাগের ভাব ও রস সঞ্চারে এবং সম্বাদী অর্থাৎ রাগের প্রধান সহায়ক সুর। রাগের যথাযত উপস্থাপনা অনেকখানি নির্ভর করে গায়কের বাদী ও সম্বাদী সুর ব্যাবহারের দক্ষতার উপর।
গান শেষ করে ইমন বুঝতে পারলো যে তার আরোহণ ও অবরোহণের পর্বগুলি যথাযত হলেও বাদীর সুর ঠিকঠাক লাগেনি। আশেপাশের শ্রোতারা কেউ সঙ্গীত বিশারদ না হওয়ায় এই গলদ ধরতে পারেনি, তাঁরা গান শুনে বাহবা দিতে লাগলো। কিন্তু ইমনের মনটা খুঁতখুঁত করতে থাকলো। সকালে রেওয়াজের সময় তানপুরার সাথে সুর লাগাতে তার কোনো অসুবিধাই হয়নি, তবে কি তানপুরায় কোনো সমস্যা হল? মনে মনে সে স্থির করল যে পরের দিনই গানের স্যার অমিয়বাবুর কাছে গিয়ে তানপুরাটা একবার দেখিয়ে নেবে।
২
গানের স্যার অমিয়বাবু ভারী অমায়িক লোক।তিনি তাঁর ছাত্রদের শুধু গানই শেখান না, তাদের কাছে সেই গান বা রাগের উৎপত্তি, ইতিহাস সবকিছুই আলোচনা করেন। তাঁর মনে হয় এতে ছাত্রদের গানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। মেঘমল্লার রাগটি শেখানোর সময় তিনি ইমনদের শুনিয়েছিলেন যে মিয়াঁ তানসেনের নাম এই রাগটির সাথে কীভাবে জড়িয়ে গেল।
মিয়াঁ তানসেন ছিলেন সম্রাট আকবরের সভার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ ও বিখ্যাত নবরত্নের একজন। সম্রাটের খুব প্রিয়পাত্র হওয়ায় বাকী সভাসদদের কাছে তিনি বিরাগভাজন হন। তাঁরা তখন ষড়যন্ত্র করে সম্রাটের কানে তোলেন যে রাগ দীপক গাইলে নাকি প্রদীপ জ্বলে ওঠে। সম্রাট এই আশ্চর্য কথা শুনে তানসেনকে অনুরোধ করেন এই রাগ গাইতে। তানসেন সভাসদদের অভিসন্ধি বুঝতে পারলেও সম্রাটের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। সব জেনেও তিনি রাগ দীপক গাইলেন। এই রাগ সঠিকভাবে গাইলে এত তাপ উৎপন্ন হয় যে তাতে আশেপাশের সবকিছুতে আগুন ধরে যায়। ফলে তানসেনের গানে আকবরের সভার সব প্রদীপ জ্বলে উঠলো কিন্তু সেই একই তাপে তানসেনের শরীরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল। কথায় আছে যে সভাসদদের অভিসন্ধি টের পেয়ে তানসেন তাঁর কন্যাকে আগে থেকেই সে সময় মেঘমল্লার রাগ গাওয়ার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর কন্যা সময়মত সেই রাগ ধরায় সে যাত্রায় তানসেনের জীবন রক্ষা পায়। আবার অন্য একটি কাহিনী অনুযায়ী, রাগ দীপকে ক্ষতিগ্রস্ত শরীর ঠিক করতে তানসেন যখন ভারতবর্ষের নানা স্থানে ঘুরছিলেন, তখন দুই বোন এবং বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞা – তানা এবং রিরির গলায় মেঘমল্লার শুনে তাঁর ক্ষত নিরাময় হয়। গানের সাথে এইসব প্রাণের কাহিনী মিশিয়ে অমিয়বাবু সঙ্গীতকে ছাত্রদের কাছে আরও চিত্তাকর্ষক করে তোলেন। তাই ছাত্রদের কাছে তিনি ভীষণ প্রিয়।
ইমন যখন তাঁর বাড়ী পৌঁছালো তখন তিনি সবে বাজারে বের হচ্ছেন। ইমনের সব কথা শুনে তিনি হেসে বললেন – “ সমস্যা যখন হয়েছে, তখন সেটা হয় যন্ত্রের, না হয় মানুষের! তানপুরাটা রেখে যা, আগে ওর কানটা মলে দেখি, যদি সমস্যা না মিটে তবে তোরটাও মলে দেখতে হবে!”
৩
অমিয়বাবুর কাছে তানপুরাটা রেখে বাড়ী ফিরে ইমনের মনে পড়লো যে আজ তো গোকুলবাবুর ক্লাস, গানের চিন্তায় ফিজিক্সের হোমওয়ার্ক করতেই সে ভুলে গেছে!
গোকুলনাথ গিরি গোবর্ধনপুর হাইস্কুলের এক ডাকসাইটে শিক্ষক। তাঁর যেমনি দোহারা গড়ন, তেমনি হেঁড়ে গলা। ছাত্র ঠ্যাঙানোর ব্যাপারেও তাঁর মাথায় অভিনব সব চিন্তা! সব মিলিয়ে ছাত্রদের কাছে তিনি এক জীবন্ত ত্রাস। সেই গোকুলবাবুর ক্লাসে হোমওয়ার্ক না করে যাওয়া মানে নিজে যেচে সাক্ষাত যমরাজের দর্শনপ্রার্থী হওয়া! ভয়ে তটস্থ হয়ে ইমন আজ একেবারে পিছনের বেঞ্চে বসেছে আর মনে মনে ঠাকুরের নাম জপ করছে। গোকুলবাবু ক্লাসে এসে প্রথমেই ক্লাসের সবচেয়ে মূর্তিমান গবেট ধীমান ওরফে পলটুকে প্রশ্ন করলেন – “ এসকেপ ভেলোসিটি কাকে বলে?” পলটু তার নামের প্রতি পূর্ণ সুবিচার করে নির্ভীক গলায় জবাব দিল – “স্যার, রাস্তার পাগলা কুকুর বা ষাঁড় তাড়া করলে যে গতিবেগে দৌড়ে তার থেকে নিস্তার মেলে তাকেই এসকেপ ভেলোসিটি বলে।” তার উত্তর শুনে গোটা ক্লাস হোহো করে হেসে উঠলো, ছাত্র ঠ্যাঙানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গোকুলবাবুর হাতও নিশপিশ করতে লাগলো। ক্লাসে হঠাৎ ওঠা এই হাসির রোলের সুযোগ নিয়ে পিছনের দিক থেকে কে যেন বলে উঠলো – “ হেঁড়ে গলা চৌকিদার, বলছে হেঁকে খবরদার!”
ব্যাস আর যায় কোথায়! কানে একথা যেতেই গোকুলবাবু প্রচণ্ড রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্লাসের একেবারে পিছনের দিকে এসে গর্জে উঠে তিনি বললেন – “ এ কথা কে বললি? সাহস থাকে তো হাত তোল!” কিন্তু ক্লাসের কেউই যমরাজের সেই সমনে সাড়া দিল না। তখন তিনি পিছনের বেঞ্চের ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে তাদের মনের ভাব বুঝে অপরাধী শনাক্ত করতে লাগলেন। তাঁর চোখ পড়লো ইমনের উপর, সে হোমওয়ার্কের ভয়ে এমনিতেই জুলজুল করে তাকিয়ে ছিল। গোকুলবাবু তার মনের সেই ভয়কেই ভুল বুঝলেন। ইমনের দিকে তেড়ে গিয়ে তার জুলপি ধরে তিনি উপরের দিকে এমন টান দিলেন, যে ইমনের মনে হল যে সত্যি তার গোটা শরীর এসকেপ ভেলোসিটি পেয়ে পৃথিবীর সকল মায়ার বাঁধন কাটিয়ে উপরের দিকে ছুটে চলেছে! প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে আর্তনাদ করে উঠলো। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাসের সবাই একসাথে বলে উঠলো – “আয় ভটকাই, তোকে ধরে চটকাই!” যন্ত্রণায়, অপমানে ইমনের গোটা শরীর গরম হয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঝড়তে লাগলো!
৪
ইমন গতকাল স্কুলে যায়নি। সেদিনের ঘটনার পর তার দেহ, মন দুইই বিধ্বস্ত। সেদিন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরে তার জ্বর আসে। সেই জ্বর এখনও কমেনি। আসলে সেদিনের গ্লানি সে মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। অসুস্থতার জন্য ইমন কার্যত গৃহবন্দী। ইতিমধ্যে আজ সকালে অমিয়বাবু নিজে এসে ইমনের তানপুরাটি ফেরত দিয়ে গেছেন। কিন্তু সারাদিনে সেটি নিয়ে বসার দৈহিক বা মানসিক জোর ইমন যোগাড় করে উঠতে পারেনি।
এখন মাঝরাত, চতুর্দিক নিস্তব্ধ। খালি থেকে থেকে এক মধুর সুর হাওয়ায় ভেসে আসছে, আবার তা দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ইমন তার ঘরে তানপুরা হাতে মেঘমল্লার গাইছে। জ্বরের ঘোরে কখন যে সে তার বিছানা ছেড়ে উঠে তানপুরা নিয়ে বসেছে সে তার নিজেরই খেয়াল নেই। আজ তার তানপুরার সাথে একাত্ম হতে পেরে ইমনের মনের সকল গ্লানি দূর হয়েছে। সুরের অপূর্ব মূর্ছনায় তার দেহমনের সকল ক্ষত সেরে উঠেছে। ইমনের মনে হল তার শরীরের ভিতর যেন বেজে চলেছে তানসেনেরই তানপুরা! খুশীতে তার দুই গাল বেয়ে নেমে এল জলের ধারা।
********************

