১
গ্রামের মাঠে মঙ্গলবারের হাট বসেছে, গ্রামের নাম রাঙামাটি, গঞ্জ গোপালপুর।হাটে অন্যান্য জিনিসের সাথে গরু ছাগলেরও কেনা বেচা চলছে। হদিসপুর গ্রামের গেছো মিয়াঁ নিলামে গরু ছাগলের দর হাঁকছেন। ক্রেতাদের মধ্যে রহমত আলীও আছে। তার লুঙ্গির খোঁচে দু হাজার টাকা, বিবি মেহের তাকে এই টাকা দিয়েছে ছাগল কিনে আনার জন্য। নিলামে সচরাচর কচি ছাগলের দর ওঠে বড়জোর হাজার টাকা। রহমত তাই হাট থেকে দুটো বকরি খরিদ করার খোয়াইশ নিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা বকরি নিলামও হয়ে গেছে, কিন্তু তার কোনোটাই রহমতের পসন্দ হয়নি। এবার নিলামে উঠলো একটা ধবধবে সাদা রঙের বকরি, তার লম্বা লম্বা দুটো কান, দেহের গঠন বলে দেয় যে তার বয়স বেশী নয়। তবে সবথেকে আজীব তার চোখ দুটো, দেখলেই ভারী মায়া হয়, মনে হয় না জানি কতদিনের পুরনো রিশতা!নিলামে উঠেই রহমতের দিকে তাকিয়ে সে করুণ স্বরে ডেকে উঠলো – ব্যা অ অ! রহমত এমনিতেই দিল দরিয়া ইনসান। বকরিটাকে দেখে আর তার ডাক শুনে রহমতের কেমন যেন মায়া পড়ে গেল। মনে হল স্বয়ং খোদা জন্নত থেকে এই অবলা প্রাণীটিকে পাঠিয়েছেন তার খিদমতে! অন্য কেউ কোনো দর হাঁকার আগেই সে বকরিটার দর হেঁকে বসলো দু হাজার টাকা! এই দর শুনে গেছো মিয়াঁ আর বাকী সব ক্রেতারা তো তাজ্জব বনে গেল, কেউ আর কোনো দর হাঁকতে সাহসই পেল না। বকরিটা রহমতেরই হল। কিন্তু এই একটা খরিদেই তার সব টাকা শেষ হয়ে গেল। বকরিটা নিয়ে হাট ছাড়ার পথে সে ভাবতে লাগলো যে বাসায় ফিরে সে মেহেরকে কি সামঝাবে! এমন সময় তার মোলাকাত হল ইবলিশ শেখের সাথে।
রহমত আর ইবলিশ একই সাথে গাদারিয়ার(ছাগল চড়ানো)কাজ শুরু করে। তখন তারা দুজনেই খুব গরীব।নিজেদের বকরি খরিদ করার মত সামর্থ্য তখন তাদের ছিল না। তাই অন্যের বকরি চড়িয়েই তারা টাকা রোজগার করতো। ইবলিশ এখন প্রচুর আমির হয়েছে। তার জিম্মায় এখন একসে এক সব বড়িয়া বকরি – দুম্বা, মালওয়া কী নেই তার কাছে! তবে সবাই জানে যে সে ইনসান একেবারেই ইমানদার না, গ্রামে যখন যার বকরির উপর তার নজর পড়ে, সে নানা উপায়ে সেটাকে নিজের করে নেয়। এই কুকর্মের জন্য পেয়াদার একটা আস্ত পল্টনও সে পোষে। গ্রামের কাজী সাহেবের সাথে দোস্তি থাকায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কেউ ইনসাফ পায় না। সবাই বলে দুসরা লোকের বকরি ছিনিয়ে নিয়ে সে চড়া দামে কসাইখানায় বিক্রি করে দেয়। একসাথে কাজ শুরু করলেও রহমত তাই ইবলিশকে এড়িয়েই চলে।
কিন্তু আজ হাট ছেড়ে বেরোনোর পথে রহমত আর তাকে এড়িয়ে যেতে পারলো না। ইবলিশ যেচে রহমতের সাথে মোলাকাত করতে এল। কিছুক্ষণ বাৎচিত হওয়ার পর রহমত বুঝতে পারলো যে এই সবই ইবলিশের বাহানা, তার আসল নজর বকরিটার উপর। রহমত হাট থেকে সেটা দুহাজার টাকায় খরিদ করেছে শুনে সে তার লম্বা দাঁড়ির ফাঁক দিয়ে এক বাঁকা ক্রূর হাসি হেসে বললো – “আমার আজ পৌঁছাতে দের হয়ে গেল, ভরনা এই বকরির দর আরও উঁচা উঠতো! এ তো রইস ঘরানার বকরি আছে, এর দেখভাল করতেও প্রচুর খরচ হবে। তুই ভালো করে ভেবে দেখ। না হলে এই দোস্তকে ইয়াদ করিস। তুই তো জানিস, ইয়ার দোস্তকে সাহায্য করায় ইবলিশ কখনও পিছু হটে না!” ইবলিশের কথার বাঁকা ইঙ্গিত বুঝতে পেরে, রহমত আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ীর পথ ধরলো।
২
রাঙামাটি গ্রামে ঘরের জানালার সামনে বসে মেহের বিবি তার শোহরের রাহ দেখছিল। মেহেরের পুরো নাম মেহেরুন্নেসা, তার আম্মি মতি বিবি ছোট থেকে আদর করে তাকে মেহের বলে ডাকেন। সে তার আম্মির খুব পেয়ারী। তার গ্রামের নাম হেনা, কারণ সে গ্রামে এক আনোখা হেনা গাছ আছে। সেই গাছ থেকে বানানো মেহেন্দি হাতে একবার পড়লে তা তামাম উমর থেকে যায়। পানি লাগলে সেই মেহেন্দি আরও পোক্তা হয়, তার রঙ আরও খোলে। হেনাগ্রামের মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের লড়কীরা শাদির সময় এই মেহেন্দি পড়লে মেহেন্দির মত তাদের সুহাগও চিরস্থায়ী হয়। মেহেরের শাদির সময় তার আম্মি তাকে নিজে হাতে এই মেহেন্দি পড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই মেহেন্দি হাতেই মেহের একদিন এই গ্রামের মেঠো পথ ধরে তার শোহরের ভিটেয় পা রেখেছিল। সে প্রায় বিশ বছর আগের কথা।কিন্তু সেই দিনটা আজও মেহেরের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে, ঠিক যেমন শাদির দিন পড়া তার হাতের মেহেন্দি্!
মেহের লেখাপড়ায় খুব তেজ ছিল। তাই এক গাদারিয়ার সাথে যখন তার শাদি ঠিক হল সে তাতে একেবারে রাজি হয় নি।কিন্তু শাদির পর একসাথে ঘর করে সে বুঝেছে যে রহমতের দিল একেবারে খোদার নিজের হাতে গড়া। সে গরীব হতে পারে, কিন্তু ইনসানটা সে একেবারে সাচ্চা। শাদির পর রহমতের অবস্থা আগের থেকে বেহতর হয়েছে। গাদারিয়া হিসাবে তার যথেষ্ট নামডাক আছে। একজন ভাল গাদারিয়া হতে গেলে তাকে দুটো ব্যাপারে মাহির হতে হয়। এক, হাওয়ার গন্ধ শুঁকে মালুম করে ফেলা যে কচি ঘাসের জমিন কোনদিকে আছে। আর দুই, আসমানের দিকে তাকিয়েই বুঝে যাওয়া যে বারীশ হবে কি না! রহমত এই দুটো ব্যাপারেই খুব হুঁশিয়ার। তবে কোনো তকলিফ এ পড়লে রহমত তার বিবির সাথেই সলাহ করে। কারণ সেও মানে যে মেহেরের দিমাগ খুব তেজ চলে।
মেহের আর রহমতের ছেলে জামাল, তার উমর সতরাহ সাল। সেও তার আব্বুর সাথে বকরি চড়ানোর কাজ করে। জামাল জাওয়ান হলে মেহের তার শাদি দেবে, জামালের বিবিকে সে নিজের হাতে তার গাঁওয়ের মেহেন্দি পড়াবে – সেই দিনটার পথ চেয়ে মেহের কবে থেকে বসে আছে।
অবশেষে রহমত বাড়ী ফিরলো। বিবিকে আর কোনো কৈফিয়ত তার দিতে হল না, মেহের আর জামাল দুজনেরই বকরিটাকে দেখে দিলখুশ হয়ে গেছে। তাদের বাড়ীতে নয়া বকরি এলে মেহেরই তার নাম দেয়। সে খুশ হয়ে এই বকরিটার নাম রাখলো রুক্সানা।
দেখতে দেখতে রুক্সানা তাদের পরিবারের এক সদস্য হয়ে গেল। রহমত তার বাকী বকরি চড়াতে লাগলো, রুক্সানার দেখভালের জিম্মা পড়লো জামালের উপর। ধীরে ধীরে জামালের সাথে রুক্সানার এক আনোখা দোস্তি গড়ে উঠলো। খিদে পেলে রুক্সানা এখন খালি জামালের হাত থেকেই কাঁঠাল পাতা খায়। জামাল তার লম্বা দুটো কানে হাত বুলিয়ে দিলে সে আরামে চোখ বুজে ফেলে। এক ইনসান আর এক জানয়ার এর মাঝে এত মহব্বত দেখে নিশ্চয়ই উপরওয়ালাও মুচকি হাসেন!
৩
কিন্তু তাদের এই সুখ উপরওয়ালার বেশীদিন বরদাস্ত হল না। ইবলিশের কথা রহমত বিবির কাছে বেমালুম চেপে গিয়েছিল। ইবলিশ কিন্তু বকরিটার কথা ভোলে নি!
ইবলিশকে দেখলে মনে হয় ঠিক যেন আরব্য রজনীর গল্পের এক দুষ্টু জিন। বিশাল দোহারা গড়ন, কামানো মাথা আর লম্বা দাঁড়ি – রাতের অন্ধকারে দেখলে যে কেউ বেহোশ হয়ে যাবে। তবে ইবলিশের স্বভাব আরও ভয়ঙ্কর। সে আপন পরে ফারাক বোঝে না, অন্যের যে জিনিস তার পসন্দ হয়, সেটাকেই সে ছিনিয়ে নেয়, সে জিনিসটা বকরি হোক বা ইনসান!
রহমতের মাথায় বাজ পড়লো যেদিন সন্ধ্যায় খোদ কাজী সাহেব তাকে তলব করে ইত্তিলা দিলেন যে ইবলিশ তার নামে বকরি চুরির অভিযোগ দায়ের করেছে। ইবলিশ নাকি হাট থেকে দুহাজার টাকা দিয়ে একটা সফেদ বকরি খরিদ করেছিল। কে বা কারা সেটাকে গুম করে দিয়েছে। রহমতের ছেলে জামালকে নাকি সেই সফেদ বকরিটার সাথে দেখা গিয়েছে। কাজী সাহেব রহমতকে বকরিটা ভালয় ভালয় ওয়াপাস করে দেওয়ার সলাহ দিলেন। ইবলিশ নাকি বলেছে বকরি ওয়াপাস পেলে সে তার দোস্তের গুণা মাফ করে দেবে। কাজী সাহেব এও জানালেন যে পরেরদিন সকালবেলায় তিনি, ইবলিশ আর তার পেয়াদার দল রহমতের ভিটেয় যাবে বকরিটা ওয়াপাস নিতে!
৪
রাঙামাটি গ্রামে চৈত্রমাসের এক সকাল, পূবদিকে সবে ভোরের আলো ফুটছে। রহমত তার অভিজ্ঞ চোখে বারীশের সম্ভাবনা দেখে চটজলদি সবকটা বকরি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো। যখন সে ওয়াপাস এল, তার ভিটেয় ইবলিশ আর তার পেয়াদার দল, সাথে খোদ কাজী সাহেব। তারা সবাই মিলে মেহের বিবি আর জামালকে রহমতের পতা জানতে চেয়ে শাসাচ্ছে। রহমত আর বকরিরা ফিরে আসায় সেই চোখ রাঙ্গানি বন্ধ হল। তখন তাদের সবার নজর পড়লো বকরিদের উপর। কিন্তু কাজী সাহেব হাজার তলাশ করেও সেই বকরির পালে কোনো সফেদ বকরি পেলেন না! রহমতের বকরির সংখ্যা তাঁর আগেই মালুম করা ছিল, সেই সংখ্যা মিলিয়ে তিনি দেখলেন যে, সবকটি বকরিই সেখানে হাজির। ইবলিশ তখন ক্রুদ্ধ দৈত্যর মত হুঙ্কার ছেড়ে রহমতকে সওয়াল করলো – “সফেদ বকরিটা কোথায়?” রহমত শান্ত ধীর গলায় জবাব দিল – “আমার কাছে কোই সফেদ বকরি নেই।” অতঃপর উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে কাজী সাহেব ইবলিশের দায়ের করা অভিযোগ খারিজ করতে বাধ্য হলেন। বোতলে বন্দী জিনের মত একরাশ চাপা আক্রোশ নিয়ে ইবলিশ সেখান থেকে বিদায় নিল।
শয়তান তার চোখ দিয়ে ফারিস্তার কেবল বাইরেটাই দেখতে পায়, কিন্তু আচ্ছা ইনসান ফারিস্তাকে দেখে তার মনের চোখ দিয়ে। তাই ফারিস্তা অন্যরূপে দেখা দিলে, শয়তান তাঁকে চিনতে ভুল করে, আচ্ছা ইনসান কিন্তু তাঁকে ঠিকই চিনে নেয়!
ইবলিশের দল ভিটে ছাড়লে রহমতের গোটা পরিবার স্বস্তির শ্বাস ফেললো। এতক্ষণ তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, এবার তারা রাহাত পেল। রহমতের সাথে চোখাচোখি হতেই মেহেরের মুখে একটা দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সে পালের একটা খয়েরী রঙের বকরির দিকে তাকিয়ে বললো – “ রুক্সানা, আমি নিজে হাতে তোকে মেহেন্দি করলাম, তোকেই আমি জামালের বিবি করবো!” শাদির কথা শুনে জামালের গাল শরমে লাল হয়ে উঠলো। মেহের বিবি রুক্সানার দিকে তাকিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো – “ কী রে রুক্সানা, নিকাহ কবুল তো?” রুক্সানা তার সফেদ লম্বা কান দুটো দুলিয়ে জবাব দিল – “ব্যা অ অ…।”
********************

