পীরপঞ্জর
১
সময়টা ষোড়শ শতক, যমুনার তীরে এক ক্ষুদ্র গ্রাম। গোটা বিশ পরিবারের বাস সেই গ্রামে। অধিকাংশ পরিবারেরই জীবিকা কৃষিকাজ। গ্রামের মানুষ দিনের বেলায় গায়ের ঘাম ঝরিয়ে জমিতে চাষ করে, আর সূর্যাস্তের পর প্রকৃতির কোলে পরিবারের লোকজনের মাঝে সময় কাটিয়ে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। প্রচুর ধনসম্পত্তি না থাকলেও সেখানকার মানুষ গরীব নয়। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের মাথার উপর নিজস্ব ছাদ, বাড়ীর আঙিনায় ছোট বাগিচা, বাগিচায় নানা রঙের ফুল আর মানুষের মনের ভিতর অপরিসীম শান্তি। বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও শান্ত, নিরিবিলি গ্রামটি তার আড়ম্বরহীন জীবনযাত্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
প্রকৃতিও গ্রামটির প্রতি অকৃপণ। যমুনার তীরের উর্বর মাটিতে সেখানে বছরে বারো মাসই ফসল ফলে। পরিবারের জোয়ান মরদরা সেই ফসল বিক্রি করে আসে দিল্লীর বাজারে। দিল্লী থেকে গ্রামটির দূরত্ব প্রায় পাঁচ ক্রোশ। কিন্তু দিল্লীর বাজারে ফসল বিক্রি করলে দাম বেশী মেলে।
দিল্লীর সুলতান এখন ইব্রাহিম খান লোদি। সুলতান ও তাঁর আমীর ওমরাহদের হাতে প্রচুর ধনসম্পত্তি। তাই দিল্লীর বাজারে সব জিনিসেরই দাম চড়া। সুলতানের এই অতুল বৈভবের খবর সর্বজনবিদিত। তাই দেশের ভিতর ও বাইরে তাঁর শত্রুর অভাব নেই। সুলতান তাঁর রাজত্বের প্রথম কয়েকটি বছর আফগান রাজবংশের আভ্যন্তরীণ বিবাদ দমনেই অতিবাহিত করেছেন। কড়া শাসনের জন্য লোদি বংশের অনেকের কাছেই তিনি অপ্রিয়। সেইসব ঘরশত্রুদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করতে সুলতান গড়ে তুলেছেন এক বিশাল ফৌজ। সেই বিশাল সেনাবাহিনী সর্বদা দিল্লীর দুর্গ আগলে রাখে।
তবে সলতানাতের বাইরে থেকেও বহু মানুষ দিল্লী আসে নানা কাজে। বহিরাগত সেইসব মানুষদের মধ্যে কেউ কেউ দিল্লী রওনা হওয়ার আগে একদিনের জন্য আশ্রয় নেয় ছোট গ্রামটিতে। গ্রামের মানুষ তখন সেই মানুষটির দেখভাল করে, তাকে নিজেদের মেহমান মনে করে তার যত্ন নেয়। সেই অতিথিকে কাছে পেয়ে তার কাছ থেকে অজানা দেশ, অজানা মানুষের খবর পাওয়ার চেষ্টা করে। সেইদিন সেই বহিরাগতকে পেয়ে গ্রামের মানুষ তাদের গতানুগতিক জীবন থেকে মুক্তির পথ খোঁজে।
২
বৈশাখ মাসের এক বিকাল, যমুনার জলে সূর্যাস্তের ছায়া পড়ে রক্তিমবর্ণ ধারণ করেছে। যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে একটি নীরব প্রাণ সেই দৃশ্য উপভোগ করছে। তার শাখাপ্রশাখায় বিচিত্র সব প্রাণের হিল্লোল। তার অঙ্গের সুবাসে চতুর্দিক আমোদিত। সেই সুগন্ধের টানে তার কাছে নানা আকারের, নানা রঙের সব পাখীর নিত্য যাতায়াত। এক রূপবান যুবকের মতই এই জনপ্রিয়তা সে সারাদিন ধরে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। কিন্তু দিনের ঠিক এই সময়টা যখন যমুনার জলে সূর্যাস্তের ছায়া পড়ে, তখন তার শাখায় প্রতিদিন এসে বসে একটি ধবধবে সাদা রাজহংসী। রাজহংসীর স্পর্শে তার সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়ে ওঠে, যমুনার জলে শ্বেতচন্দনের ছায়া তার অজান্তেই ধীরে ধীরে রক্তিমবর্ণ ধারণ করে। সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত সেই দুটি প্রাণ একইভাবে ঘনসংলগ্ন থেকে সময় অতিবাহিত করে। তারপর বাড়ীর ভিতর থেকে ডাক আসে, বিদায় নেয় সেই রাজহংসী। বিদায়লগ্নে তার ভারী ইচ্ছা করে বাগিচার একটি বসরাই গোলাপ তুলে তার প্রিয়তমাকে দিতে। কিন্তু দিনের এই একটিই সময় নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তার আফসোস জাগে। সন্ধ্যার সেই অন্ধকারে শুধু কয়েকফোঁটা জল সেই শ্বেতচন্দনের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যমুনার জলে!
সন্ধ্যায় সেই রাজহংসী ফিরে যায় তার ঘরে, সেখানে জাহানারা বিবি খাবার সাজিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে। জাহানারা এই গ্রামেরই এক পরিবারের বেগম। সে তার শোহর হাসানকে নিয়ে এই গ্রামে বাস করে। গ্রামের বাকী মরদদের মত হাসানও দিনের বেলায় জমিতে চাষ করে। সেই সময়টা জাহানারা বাড়ীর কামরা সাফ করে, উঠানে গোবরের প্রলেপ দেয় আর পরিবারের বাকী সদস্যদের দেখভাল করে। হাসানের সাথে তার নিকাহ হয়েছিল বছর চারেক আগে। কিন্তু এখনও আল্লাহ তার কোল আলো করতে কোনো নানহা ফারিস্তাকে পাঠাননি। জাহানারা তাই রোজ খোদার কাছে দুয়া করে আর আশেপাশের সকল প্রাণীকে সেই খোদার দূত মনে করে তাদের দেখভাল করে। তাদের বাড়ীর পিছন দিকে যমুনার তীরে আছে এক শ্বেতচন্দন গাছ, তার সুগন্ধ জাহানারাকে ইবাদাতের কথা মনে করায়। সেই গাছটিকে সে পীর মেনে তার যত্ন নেয়। তাদের বাগিচায় নানা রঙের ফুল গাছ, জাহানারাই তাদের দেখভাল করে। সেই বাগিচা আলো করে রাখে এক লাল রঙের বসরাই গোলাপ। তার যেমন উজ্জ্বল রঙ, তেমনি মিষ্টি গন্ধ। তার সুবাস আঁতরের গন্ধকেও হার মানায়! সেই বাগিচার পাশেই ঘুরে বেড়ায় নূর – জাহানারার পোষা রাজহংসী। তাকে সে নিজের প্রাণের থেকেও বেশী ভালবাসে। নূরের দেখভাল করে সে খানিকটা হলেও মাতৃত্বের স্বাদ পায়।
সন্ধ্যায় হাসান বাড়ী ফেরে। তার আগে জাহানারা যমুনার জলে তার সারাদিনের একাকীত্ব ধুয়ে ফেলে। নূরের জন্য খাবার সাজিয়ে রেখে সে নিজের ঘরে যায়। তারপর চোখে সুরমা লেপে, গায়ে আঁতর মেখে সে নিজেকে তৈরী করে। সারাদিন পর বাড়ী ফিরে জাহানারাকে দেখে হাসানের সকল ক্লান্তি দূর হয়। কিন্তু একইসাথে জাহানারার একাকীত্বের কথা ভেবে তার সিনার ভিতরটা জ্বলতে থাকে।
অন্যদিনের মত হাসান সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে গোসল সেরে নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুযোগ বুঝে জাহানারা তার মনের কথাটা পেড়েই ফেললো। হাসানকে সে অনুযোগের সুরে বললো – “তুমি সারাদিন খালি তোমার কাজ নিয়েই থাকো, আমার কোনো ফিকরই তোমার নেই। আমার কোনো কথাই আজকাল আর তোমার ইয়াদ থাকে না!” বিবির অভিযোগ শুনে হাসান সহজেই অনুমান করতে পারলো যে আলোচনাটা ঠিক কোনদিকে যাবে। তবু সে অজানার ভান করে বললো – “ঠিক কোন কথাটা বলছো বলতো?” জাহানারা মুখ ফুলিয়ে জবাব দিল – “সেই কবে থেকে তোমায় বলছি আমায় একবার পীরবাবার দরগায় নিয়ে যেতে, শুনেছি সেখানে মান্নাত করলে নাকি অওলাদ নসিব হয়।” জাহানারা মাঝে মাঝেই তার এই খোয়াইশের কথা হাসানকে ইয়াদ করায়। কিন্তু পীরবাবার দরগা দিল্লীতে। সেখানকার মাহোল এখন উত্তপ্ত হয়ে আছে। সুলতানের নিজের লোকদের মধ্যেই ঝামেলা। হাসান শুনেছে যে সুলতানকে সরাতে তাঁর বিশ্বস্ত লোকজনই নাকি বাবর নামের এক বহিরাগতকে দাওয়াত দিয়েছে। তাই দিল্লীর হাওয়ায় এখন চক্রান্তের গন্ধ, যে কোনো মুহূর্তে একটা জাঙ্গ লেগে যেতে পারে। এই বিপদের মধ্যে হাসান তার বিবিকে নিয়ে দিল্লী যেতে ভয় পায়। তাই সে জাহানারার খোয়াইশ শুনেও প্রতিবার তা এড়িয়ে যায়। কিন্তু বিবিকে সরাসরি ইনকার করতেও তার বাঁধে, কারণ বিবির তকলিফটা হাসান বোঝে। তাই সে জাহানারাকে তসল্লী দিয়ে বললো – “বেশ তো, পরের মাসে ফসল কাটা হলে আমায় তো একবার দিল্লী যেতেই হবে, তখন না হয় তুমিও আমার সাথে গিয়ে পীরবাবার দরগায় মান্নাত করে এসো।” হাসানের কথা শুনে জাহানারা আশ্বস্ত হয়ে রাতের খাবার বানাতে রসোই ঘরে প্রবেশ করলো। পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামলানো গেছে ভেবে হাসানও নামাজ পড়তে অগ্রসর হল।
৩
কিন্তু পরের মাস অবধি আর অপেক্ষা করতে হল না। দিন দুয়েক পরেই এক পবিত্র জুম্মাবারে গ্রামে এসে উপস্থিত হলেন এক পীর-ফকির। তাঁর উমর আন্দাজ চল্লিশ, পরনে খাটো জোব্বা। পীর সাহেবের বলিষ্ঠ চেহারা, কিন্তু তাঁর চোখে মুখে বহু জন্মের ক্লান্তি। দেখে বোঝা যায় যে বহুদিন তাঁর খানাপিনা নসিব হয়নি। গ্রামের মানুষ আদর করে তাঁকে গ্রামের ভিতর ঠাঁই দিল, ঘর থেকে খেজুর আর জল এনে তাঁকে খেতে দিল। খাবার খেয়ে পীর সাহেব অনেকটা বেহতর বোধ করতে লাগলেন। কথায় কথায় জানা গেল যে তিনি এক ফকির, দেশের নানা প্রান্তে তিনি ঘুরে বেড়ান। বর্তমানে তিনি এসেছিলেন দিল্লীতে পীরবাবার দরগায় তীর্থ করতে। দিল্লী থেকে ফেরার সময় পথে গরমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
হাসানের মুখে ফকিরের কথা শুনে জাহানারার ভারী মায়া হল। সে হাসানকে বললো ফকিরকে তাদের বাড়ীতে মেহমান করে নিয়ে আসতে, তাঁর খানাপিনার জিম্মেদারী সে নিজে নেবে। অনেক নসিব করে এলে তবেই খোদা কাউকে এক পীর-ফকিরের খিদমত করার মওকা দেন, সেই মওকা জাহানারা কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলো না। অতঃপর সেই ফকির হাসান-জাহানারার মেহমান হয়ে সেই গ্রামেই থাকতে লাগলো।
জাহানারার পরিবারে এক নতুন সদস্য যোগ হল। শ্বেতচন্দন, বাগিচার ফুলগাছ আর নূরের সাথে সাথে সে ফকিরেরও দেখভাল করতে লাগলো। এতদিন তার সাথে দিনেরবেলায় কথা বলার কেউ ছিল না, ফকিরকে পেয়ে তার সেই অভাব পূরণ হল। ফকিরও এক উৎসুক শ্রোতা পেয়ে তাকে নিজের দেশভ্রমণের নানা গল্প শোনাতে লাগলো।
তারপর হঠাৎই একদিন গ্রামে খবর এসে পৌঁছালো যে দিল্লীর সুলতান পানিপথের যুদ্ধে বহিরাগত মুঘলদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। মুঘল সৈন্য দিল্লীর পথে এগিয়ে আসছে। গ্রামে দিল্লীর খবর এক হপ্তা দেরীতে পৌঁছায়। তাই কারও আর বুঝতে বাকী রইলো না যে ঘোর সঙ্কট আসন্ন, মুঘল সৈন্য ততদিনে নিশ্চয় দিল্লী পৌঁছে গেছে! তারপর তাদের আশঙ্কা সত্যি করে একদিন চারিদিক ধুলোর চাদরে ঢেকে গ্রামের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হল মুঘল অশ্বারোহী দল।
৪
১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে এপ্রিল, পানিপথের প্রান্তরে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। একদিকে লাহোরের শাসক দৌলত খান লোদির আমন্ত্রণে ভারতবর্ষে অনুপ্রবেশকারী মুঘল সেনা আর অন্যদিকে দিল্লীর সলতানাত রক্ষাকারী সুলতানের বিশাল ফৌজ। দিল্লীর সুলতানের আচরণে ক্ষুব্ধ দৌলত খান লাহোরের ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় সমরখন্দের শাসক বাবরকে দিল্লী দখলের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বাবর তাঁর রণনিপুণ মুঘল সেনা নিয়ে হাজির হন পানিপথের প্রান্তরে, তাঁর লক্ষ্য দিল্লীর মসনদ। সেখানে মুঘল সেনার গতিরোধ করে দিল্লীর ফৌজ।
উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ বাধে। বাবরের সৈন্য সংখ্যায় অনেক কম হলেও তারা ছিল অত্যন্ত সুদক্ষ যোদ্ধা ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। মুঘল সেনার গোলন্দাজ বাহিনী এই যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে সুলতানের ফৌজ সুবিশাল হলেও তাদের কাছে কামানের মত আধুনিক হাতিয়ার ছিল না। বাবরের চতুর রণকৌশলে দিল্লীর ফৌজের একটা বড় অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। মুঘল কামানের গগনভেদী শব্দে সুলতানের ফৌজের হাতির দল ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে থাকে। এতে সুলতানের ফৌজের বহু সৈন্য মারা যায়।
যুদ্ধে বাবর জয়ী হন। দিল্লীর ফৌজের প্রায় বিশ হাজার সৈন্য প্রাণ হারায়। দিল্লীর সুলতান ইব্রাহিম খান লোদি নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারান। সুলতানের ফৌজের বহু আহত সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে প্রাণরক্ষার চেষ্টা করে। মুঘল সেনা তাদের পিছু নেয়। পরের বেশ কয়েকমাস দিল্লী ও তার আশেপাশে মুঘল সেনা তল্লাশি চালায়, নানা অছিলায় গ্রামের পর গ্রাম লুঠ করে। দিল্লীর আশেপাশের গ্রামগুলির মানুষের জীবনে নেমে আসে এক চরম সঙ্কট।
৫
সূর্যাস্তের ঠিক আগে ঘোড়ার খুরের শব্দে চারিদিক মুখরিত করে গ্রামের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হল মুঘল অশ্বারোহী দল। তাদের দেখে গ্রামের মরদরা সব এক জায়গায় সমবেত হল, বাচ্চা আর মেয়েরা ঘরের ভিতরে থেকেই আশঙ্কার প্রহর গুণতে লাগলো। মুঘল সেনাদলের সর্দার সমবেত গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে গলা উঁচিয়ে বলে উঠলেন – “হুশিয়ার! আমাদের কাছে এত্তেলা আছে যে মুঘলদের হাতে পরাজিত কয়েকজন সেপাই ফেরার হয়ে এই গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছে। কাল ঠিক বেলা বারোটার সময় যদি সেই সেপাইদের আমাদের হাতে তুলে না দেওয়া হয়, তবে আমরা এই গ্রামের সবাইকে জাহান্নামের রাস্তা দেখিয়ে ছাড়বো!”
মুঘল সর্দারের এই রক্তহিম করা হুমকি শুনে সমবেত গ্রামবাসীর মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেল। তারা সেদিন সন্ধ্যায় আবার জড়ো হল মুঘলদের হাত থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে। নিজেদের মধ্যে সলাহ করে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো যে সৈন্য ফেরার হওয়ার ঘটনাটা মুঘলসেনার ফিকিরমাত্র, তাদের আসল নজর নিশ্চয়ই গ্রামবাসীর ধনসম্পত্তির উপর। তাই তারা স্থির করলো যে সেই রাতেই তারা তাদের সমস্ত মূল্যবান জিনিস একত্রিত করে ফেলবে। পরেরদিন তারা সেই সম্পদ মুঘল সর্দারের হাতে তুলে দেবে দিল্লীর নতুন বাদশাহের নজরানা হিসাবে। তাদের মনে হল নজরানা পেয়ে খুশ হয়ে সর্দার হয়তো এযাত্রায় তাদের রেহাই দেবেন। পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে গিয়ে গোটা গ্রাম সেইরাত জেগেই কাটালো। তারপর ভোররাতে ক্লান্ত গ্রামবাসীরা দুঃশ্চিন্তার বোঝা ঘাড়ে করে ঘুমোতে গেল।
গোটা গ্রামে যখন এই আয়োজন চলছিল, তখন পীর-ফকির রাতের আহার করতে বসেছিলেন। জাহানারা তাঁকে খাবার পরিবেশন করছিল। গ্রামের এই সঙ্কটের কথা তাদের দুজনেরই জানা ছিল। ফকিরের আজ যেন আর খাওয়ায় মন নেই। তিনি খেতে খেতে জাহানারাকে বললেন – “বেটি, অনেকদিন হল, এবার কিন্তু আমায় বেরোতে হবে। এক জায়গায় বেশীদিন থাকলে ফকিরের পাপ লাগে!” ফকিরের কথা শুনে জাহানারার মন ভারী হয়ে উঠলো, কিন্তু ফকিরের অবস্থাটাও সে বুঝতে পারলো। সেই রাতে খাওয়ার সময় তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হল না।
পরেরদিন ভোরবেলা মুঘলসেনার হট্টগোলে গ্রামবাসীর ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে বেরিয়ে তারা দেখতে পেল যে গ্রামের পথে পড়ে আছে সেই পীর-ফকিরের নিথর দেহ, তাঁর বুকের কাছে জোব্বা ভেদ করে গেঁথে আছে মুঘলসেনার তলোয়ার। গ্রামের পথ ভেসে যাচ্ছে তাঁর রক্তে। সেই মুঘল সর্দার হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলো – “বদতামিজ সাতসকালে পালানোর মতলব করছিল। আমিও তক্কে তক্কে ছিলাম, হারামিকে নিজেহাতে একেবারে জাহান্নামের দরওয়াজা দেখিয়ে দিয়েছি!” বলেই সে আর তাঁর দলের সেনারা হাসিতে ফেটে পড়লো। এতক্ষণে গ্রামের মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। তারা রাতে মুঘলসেনার সাথে সুলাহ করার কথা ভেবেছিল। কিন্তু চোখের সামনে এক নিরীহ সন্ন্যাসীর করুণ পরিণতি দেখে তাদেরও রক্ত গরম হয়ে উঠলো। গ্রামের মেহমানের খুনীদের যোগ্য জবাব দিতে তারা নিজেদের ঘর থেকে লাঙ্গল, কোদাল যা হাতের কাছে পেল তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লো মুঘলদের উপর। মুঘলসেনা যেন এই মওকাটাই খুঁজছিল। রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মত তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো সাধারণ গ্রামবাসীর উপর। রণনিপুণ মুঘলসেনার সামনে সাধারণ গ্রামবাসীর প্রতিরোধ খড়কুটোর মত উড়ে গেল। মুঘলসেনা নির্বিচারে গ্রাম লুঠ করলো, যা কিছু লুঠ করা যায় না, তা আগুনে জ্বালিয়ে দিল। গ্রামে জীবিত বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। সবকিছু হারিয়ে যমুনার তীরের সেই শান্ত, ছোট গ্রামটি এক শ্মশানভূমিতে পরিণত হল!
৬
মুঘলসেনা গ্রাম ছেড়ে চলে গেল, পিছনে রেখে গেল এক ধ্বংসস্তূপ।
গ্রামের পথে এখনও পড়ে আছে সেই পীর-ফকিরের নিথর দেহ। তাঁর জোব্বা ভেদ করে বুকের কাছে গেঁথে আছে মুঘল সর্দারের তলোয়ার। শাণিত তরবারির তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ প্রবেশ করেছে তাঁর বুকের পাঁজরের গভীরতম অন্তঃস্থলে। তাঁর বুকের সেই অন্তঃস্থলেই লুকিয়ে আছে এক চরম বিশ্বাসঘাতকের কাহিনী। খুঁজলে ফকিরের জোব্বার ডানদিকের পকেটে মিলবে একটি ছোট সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ধারালো ছোরা। ছোরার গায়ে ফার্সীতে খোদাই করা দিল্লীর সুলতান ইব্রাহিম খান লোদির নাম। দিল্লীর ফৌজের শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ সেনাপতিদেরই প্রদান করা হত এই বাদশাহী ছোরা। ফকির আসলে পানিপথের যুদ্ধ প্রান্তর থেকে ফেরার এক সেনাপতি। যুদ্ধের পর বিজয়ী মুঘলসেনা যে অচিরেই দিল্লী এসে পৌঁছাবে তা অভিজ্ঞ যোদ্ধার অজানা ছিল না। তাই সে পালিয়ে দিল্লী থেকে দূরে কোথাও আত্মগোপনের ছক কষেছিল। গ্রামে প্রবেশ করার আগে পথে তাঁর দেখা হয় এক নিরীহ ফকিরের সাথে। সে এসেছিল সুদূর দক্ষিণ ভারত থেকে পীরবাবার দরগায় তীর্থ করতে। মওকা বুঝে চরম বিশ্বাসঘাতক সেই নিরীহ ফকিরকে হত্যা করে তাঁর পোশাক ধারণ করে। তারপর এক পীর-ফকিরের পরিচয়ে সে গ্রামে প্রবেশ করে। মুঘলসেনা পথে সেই ফকিরের মৃতদেহ খুঁজে পায়, তখনই তাদের মনে গ্রাম সম্বন্ধে সন্দেহ দানা বাঁধে। মুঘলসেনা গ্রামে এসে পড়ায়, সে পালানোর ফিকির করে। কিন্তু ভোররাতে পালাতে গিয়ে মুঘল সর্দারের অতর্কিত আক্রমণে সে প্রাণ হারায়। স্বার্থপরের মত নিজের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে সে গোটা গ্রামের বিপদ ডেকে আনে।
তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে চিরদিনের জন্য চাপা পড়ে গেল বিশ্বাসঘাতকতার সেই নির্লজ্জ কাহিনী।
হাসান আর জাহানারার বাড়ীর উঠান, সেখানে চারিদিকে শুধু শ্মশানের নিঃস্তব্ধতা। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে প্রতিটি প্রাণ। জাহানারার আদরের বাড়ী, আঙিনায় ফুলের বাগিচা কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। শুধু বাড়ীর পিছনদিকে যমুনার তীরে এখনও ধিকধিক করে জ্বলছে সেই শ্বেতচন্দন। তার পায়ের কাছে লুটিয়ে আছে এক ধবধবে সাদা রাজহংসীর রক্তাক্ত দেহ। তার রক্ত ছিটকে এসে লেগেছে শ্বেতচন্দনের গায়ে। নূর – তার প্রিয়তমা আর নেই! শ্বেতচন্দনের বুকের কাছে এক গভীর ক্ষত, অগ্নিসংযোগের আগে মুঘলসেনা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেখান থেকে কেটে নিয়েছে এক ফালি চন্দনকাঠ। দূর থেকে দেখে গাছটিকে মনে হচ্ছে ঠিক যেন বুকের পাঁজর বের করে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্লান্ত ফকির।
যমুনার তীরে অঝোরে বৃষ্টি নামলো। সেই বৃষ্টির জলে নিভে গেল ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা আগুন। বুকের ভিতর সব হারানোর হাহাকার নিয়ে অর্ধদগ্ধ অবস্থায় যমুনার তীরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো সেই শ্বেতচন্দন। শুধু কয়েকফোঁটা জল তার গা বেয়ে গড়িয়ে পড়লো যমুনার জলে!
*************************
কাফের এ কলম
১
এক মাঘী পূর্ণিমার রাত, জ্যোৎস্নার আলোয় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। সময়টা রাত্রি দ্বিপ্রহর, চতুর্দিকে সীমাহীন নিঃস্তব্ধতা। শুধু জেলেপাড়ার এক বদ্ধ কুঠুরিতে টিমটিম করে জ্বলছে একটি মাটির প্রদীপ। সেই প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় বসে এক শায়র উর্দুতে তার কবিতা লিখে চলেছেন। তার চোখমুখ সৃষ্টির আনন্দে উদ্ভাসিত। মধ্যরাতের সেই বদ্ধ কুঠুরির কালিমাও ম্লান করতে পারছেনা তার চেহারার দীপ্তিকে। শায়রের মনের সাথে তাল ঠুকে তার কলম সমানে আঁচড় কেটে চলেছে সামনে রাখা পাতার উপর। কলমের আঁচড়ে পাতার বুকে রক্ত ঝরে ফুটে উঠছে এক একটি আশ্চর্য কবিতা।
শায়র এই কুঠুরির একমাত্র বাসিন্দা। জেলেপাড়ার একেবারে শেষপ্রান্তে তার এই মাটির কুঠুরি। কুঠুরির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট পেন্নার নদী। নদীর অপর পাড়ে তাঁতিপাড়া। সেখানকার তাঁতিরা হাতে সূতীর কাপড় বোনে। সেই কাপড়ের সূক্ষ্ম সুতো পরিচিত মাদ্রাস নামে। আর জেলেপাড়া ও তাঁতিপাড়া নিয়ে তৈরী এই গ্রামটির নাম মাদ্রাসপত্তনম।
সেই ছোট্ট কুঠুরির ভিতর আসবাব বলতে প্রায় কিছুই নেই, শুধু আছে একটি মাটির প্রদীপ, গুটিকয়েক লেখার পাতা, একটি কালির দোয়াত আর সেই কলম। সেই কলম ধরে শায়র তার জীবনের সকল গ্লানি ভুলে যায়। সারাদিন তার বুকের ভিতর অবিরাম যে রক্ত ঝরে, রাতের নিঃস্তব্ধতায় তাই যেন কবিতা হয়ে ফুটে ওঠে তার কলমে। গভীর রাতের নির্জনতায় সমাজের রক্তচক্ষু এড়িয়ে শায়র তার কলম ধরে – তারপর সেই ক্ষুদ্র কুঠুরির ভিতর সারারাত ধরে চলে তাদের সেই গোপন অভিসার!
ভোরবেলা পূবের আলো কুঠুরির ছোট জানালা দিয়ে প্রবেশ করে তার মুখের উপর এসে পড়ে। তখন শেষ হয় তার কবিতা লেখা। প্রিয় কলমকে বিদায় জানিয়ে সে আবার ফিরে যায় তার নিঠুর জীবনে। বিদায়ের পূর্বে সে কলমের লম্বা সাদা পালকে হাত বুলিয়ে তাকে আদর করে, হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে তাকে ধন্যবাদ জানায়। তার বাম হাতের বুড়ো আঙুলের লম্বা নখ দিয়ে সেই কলমের গা পরিষ্কার করে দেয়। তারপর গভীর মমতা ভরে সেই কলমটিকে সে তুলে রাখে কুঠুরির এক গোপন জায়গায়।
এইভাবে এক ক্ষুদ্র কুঠুরির ভিতর সেই হতভাগ্য শায়র তার মনের ভিতরের সম্পদকে সম্বল করেই বেঁচে থাকে।
২
মুশায়রা বসেছে, তাতে উপস্থিত আশেপাশের সব মাশহুর শায়র। জায়গাটা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মানচিত্রে মাদ্রাস নামে পরিচিত আর এলাকাটার উল্লেখ দেশীয় মানুষের বাসস্থান বা ব্ল্যাক টাউন নামে। যদিও এই পরিচিতি বছরখানেকের, তার আগে জায়গাটার নাম ছিল মাদ্রাসপত্তনম। সময়টা ১৬৪১ খ্রিষ্টাব্দ। ঠিক দুবছর আগে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসার খাতিরে গ্রামটির ইজারা নিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে তারা সেখানে গড়ে তুলেছে সেন্ট জর্জ দুর্গ। সেই দুর্গের চারপাশে কোম্পানির সব গোরা সাহেবদের বাসস্থান, তাই জায়গাটার নাম হোয়াইট টাউন। আর দুর্গ থেকে দূরে যে জায়গাটায় মূলতঃ ভারতীয়দের বসবাস, তার পরিচিতি ব্ল্যাক টাউন নামে। সেন্ট জর্জ দুর্গ, হোয়াইট টাউন আর ব্ল্যাক টাউন – এই তিনে মিলেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাস।
মুশায়রায় খ্যাতনামা সব শায়ররা তাঁদের স্বরচিত শায়েরী পড়ে শোনাচ্ছেন। থেকে থেকে শ্রোতাদের দিক থেকে ভেসে আসছে নানা প্রশংসাসূচক উক্তি। মুশায়রা বসেছে হাফিজ সাহেবের হাভেলির দালানে। হাফিজ সাহেব এখন মাদ্রাসের সবথেকে নামকরা শায়র। তাঁর পূর্বপুরুষরা এই এলাকার জমিনদার ছিলেন। হাফিজ সাহেব উর্দু শায়েরীর একজন বড় পৃষ্ঠপোষক। তাঁর হাভেলিতে মাসে একবার করে শায়রদের এই আসর বসে।
এক চবুতরার উপর পাশাপাশি বসেছেন শায়ররা। তাঁদের সামনে জড়ো হয়ে বসে আছেন উৎসুক শ্রোতার দল। চবুতরার ডানদিকে হাভেলির জেনানা-মহল। দালানের সেই দিকটায় পর্দার আড়ালে বসেছেন মহিলারা। তাঁদের মধ্যে যেমন হাভেলির মহিলারা আছেন, তেমনি আছেন বহিরাগত মহিলা শ্রোতারাও। সেই বহিরাগতদের মধ্যে একজন তার বুকের ভিতর চাপা উত্তেজনা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে হাফিজ সাহেবের শায়েরীর। সব শায়রের কবিতা বলা শেষ হলে হাফিজ সাহেব তাঁর শায়েরী ধরলেন।
তাঁর শায়েরীর যাদুতে উপস্থিত শ্রোতারা অল্পসময়ের মধ্যেই সম্মোহিত হয়ে গেলেন। হাফিজ সাহেবের জবানে শায়েরীর ভাষা, তার ছন্দ এক অন্য মাত্রা পেল। শ্রোতাদের মনে হতে লাগলো তাঁরা যেন পৌঁছে গেছেন এক অন্য জগৎে, অন্য সময়ে। সেখানে শায়েরীর যাদুতে কখনও মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামলো, আবার কখনও মেঘ সরিয়ে ঝলমল করে রোদ্দুর উঠলো। শব্দ আর ছন্দের অপূর্ব মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে শ্রোতারা ভুলেই গেলেন তাঁদের বাস্তব অস্তিত্ব। হাফিজ সাহেবের শায়েরী শেষ হল এক বিশাদঘন সন্ধ্যার কাহিনী দিয়ে। বেদনার সেই কাহিনী শুনে শ্রোতাদেরও বুকের ভিতর রক্ত ঝরতে লাগলো। শায়রের তকলিফ অনুভব করে তাঁদেরও চোখে জল এল। সেই বেদনাবিধুর অনুভূতিকে সঙ্গী করেই হাফিজ সাহেব তাঁর শায়েরী শেষ করলেন। শায়েরী শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও শ্রোতারা বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে তাঁদের হুঁশ ফিরলো, দালান ফেটে পড়লো শ্রোতাদের করতালিতে।
পর্দার আড়ালে সেই শ্রোতা এতক্ষণ গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। শ্রোতাদের করতালিতে তার যেন জান্নাতের সুখ নসিব হল। পরমপ্রাপ্তির আনন্দে বোরখার ভিতর তার দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু ফোঁটা জল! উপস্থিত শ্রোতারা হাফিজ সাহেবের শায়েরীর তারিফ করতে লাগলেন। হাফিজ সাহেব তখন সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে জানালেন যে এই শায়েরী তাঁর নিজের নয়! এক গুমনামী শায়র তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে এই আশ্চর্য কবিতাগুলি লিখেছেন। একথা শুনে শ্রোতারা সেই শায়রকে একবার তাঁদের মাঝে হাজির করার জন্য হাফিজ সাহেবকে অনুরোধ করতে লাগলেন।
তাঁদের অনুরোধ শুনে বোরখার ভিতর সেই শ্রোতার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা দেখা দিল। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে সাধারণ শ্রোতাদের আসন থেকে তাকে সর্বক্ষণ অনুসরণ করে চলেছে একজোড়া চোখ!
৩
শ্রোতাদের মধ্যে বসে আছেন এক ফিরিঙ্গি সাহেব। তাঁর নাম ম্যাক্সওয়েল টার্নার, তিনি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক দক্ষ কর্মচারী। তিনি কোম্পানির হয়ে এদেশে এসেছেন প্রায় বছর দশেক আগে। ভারতবর্ষের নানা জায়গায় কোম্পানির কাজ দক্ষতার সাথে সামলে মাত্র কয়েকমাস আগে তিনি মাদ্রাসে এসে পৌঁছেছেন। কোম্পানির অন্য কর্মচারীদের মত তাঁরও বাসস্থান সেন্ট জর্জ দুর্গের পাশের হোয়াইট টাউন। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি ম্যাক্সওয়েল সাহেবের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সেই মুনাফার লোভে এমন কোনো কাজ নেই যা তাঁর করতে বাঁধে। ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে তিনি তাঁর কাজের নিদর্শন রেখে এসেছেন!
কোম্পানিও তাঁর কাজে খুব খুশী। তাই তাঁকে বদলি করা হয়েছে মাদ্রাসে। কারণ কোম্পানি মনে করে মাদ্রাস ভারতবর্ষের মানচিত্রে তাদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখানে ব্যবসা করে মুনাফা লাভের প্রচুর সুযোগ। এখানকার গরীব তাঁতিদের হাতে বোনা সূতির মসৃণ কাপড় তাদের কাছ থেকে নামমাত্র দামে কিনে ইংল্যান্ড ও তার আশেপাশের দেশগুলিতে তা চড়া দামে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা হয়। মুনাফা বাড়াতে কোম্পানির কর্মচারীরা খুব কম দামে দরাদরি করে গরীব তাঁতিদের ঠকাতেও পিছপা হয়না। কোম্পানির ঠিক করে দেওয়া কম দামে কাপড় বিক্রি করতে রাজী না হলে, দুর্বৃত্তরা গরীব তাঁতিদের উপর জুলুম করে, সর্বস্ব লুঠ করে তাদের সর্বস্বান্ত করে দেয়। ঠিক এই কারণেই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কোম্পানির কর্মচারীদের মাঝে মাঝেই তুমুল বিবাদ বাধে।
ম্যাক্সওয়েল সাহেব সেইরকমই এক মুনাফালোভী, দুর্বৃত্ত কর্মচারী। তিনি এদেশের নানা স্থানীয় ভাষায় পারদর্শী। স্থানীয় ভাষা জানা থাকলে এ দেশীয় মানুষদের সাথে দরাদরি করতে সুবিধা হয়! এই কারণেই তাঁর উর্দু শেখা। স্থানীয় ভাষা জানা থাকলে, ব্ল্যাক টাউনে ঘুরে এদেশের মানুষের মনের খবরও পাওয়া যায়। তারপর সেই খবর পৌঁছে দেওয়া যায় কোম্পানির উঁচু মহলে। কোম্পানি তখন সেই খবরের ভিত্তিতে মাদ্রাসের বুকে নিজেদের শাসনযন্ত্র সচল রাখতে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে।
মনে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই ম্যাক্সওয়েল সাহেব নিয়মিত হাজির হন হাফিজ সাহেবের মুশায়রায়। কিন্তু আজ তাঁর শিকারীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়লো পর্দার ওপাড়ের এক শ্রোতার উপর। তাঁর ধূর্ত মনের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে তিনি অন্য কিছু দেখতে পেলেন যা বাকী সকলের নজর এড়িয়ে গেল। তিনি লক্ষ্য করলেন যে সেই শ্রোতা জেনানা-মহলের বাকী শ্রোতাদের থেকে যেন সামান্য আলাদা। ম্যাক্সওয়েল সাহেবের অভিজ্ঞ চোখে সহজেই ধরা পড়ে গেল সেই শ্রোতার মনের তীব্র উৎকণ্ঠা। হাফিজ সাহেবের শায়েরীর সময় বোরখার ভিতর মানুষটির মনের চাপা উত্তেজনা তিনি তার নড়াচড়া দেখে সহজেই অনুমান করতে পারলেন। শায়েরীর শেষে বাকী শ্রোতাদের করতালিতে তার মনের বিশেষ অভিব্যক্তিও সাহেবর নজর এড়ালো না। তাঁর দক্ষ ব্যবসায়ীর মন এই ঘটনার পিছনে যুক্তি খুঁজতে গিয়ে হাফিজ সাহেবের শায়েরীর সাথে বোরখার ভিতর সেই শ্রোতার কোনো এক গভীর যোগ খুঁজে পেল। তাঁর অনুসন্ধানী মন তখন সেই শ্রোতাকে খুঁটিয়ে দেখে তার সম্বন্ধে আরও তথ্য জোগাড় করার চেষ্টা করতে লাগলো। সূক্ষ্ম পর্দার ভিতর তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চালিয়ে ম্যাক্সওয়েল সাহেব তখন দেখতে পেলেন সেই শ্রোতার বাম হাতের বুড়ো আঙুলের লম্বা নখ!
৪
রসুল মিঞার কাপড়ের দোকানে অন্যদিনের মত সূতির কাপড়ের কেনাবেচা চলছে। রসুল মিঞা এলাকার নামকরা কাপড়ের ব্যাপারী। বাজারের ঠিক মাঝখানে তাঁর কাপড়ের বড় দোকান। মাদ্রাসের ব্ল্যাক টাউনের বাজারে তখন দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা। রসুল মিঞার কাপড়ের দোকানের দুই পাশে সারিসারি দোকান, সেইসব দোকানে নানা জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে আছে স্থানীয় দোকানদাররা। জিনিসপত্র দরাদরি, কেনাবেচার তুমুল হট্টগোলে বাজারে কানপাতা দায়।
রসুল মিঞার দোকানে অন্য ক্রেতাদের সাথে এসেছেন এক ফিরিঙ্গি সাহেবও। তিনি দোকানের বাকী কর্মচারীদের এড়িয়ে সরাসরি রসুল মিঞার সাথে দর কষাকষি করছেন। রসুল মিঞাকে তিনি জানিয়েছেন যে তিনি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি, তাঁর নাম ম্যাক্সওয়েল টার্নার। কোম্পানির হয়ে সূতির কাপড় কেনার বড় চুক্তি করতে তিনি আগ্রহী। কিন্তু অতি উচ্চমানের মসৃণ সূতির কাপড়ের যে মূল্য তিনি নির্ধারণ করেছেন তা বাজার দরের চেয়ে অনেক কম। রসুল মিঞা তাতে কিছুতেই সম্মত না হওয়ায় চতুর ফিরিঙ্গি তাঁকে নানা কথায় রাজী করানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। সাহেব কোম্পানির তরফ থেকে রসুল মিঞাকে ব্যবসায় কিছু বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনও দেখালেন। কিন্তু অভিজ্ঞ ব্যাপারীর মন কিছুতেই সেই লোভের ফাঁদে পা দিল না। তখন রাগে হতাশায় ম্যাক্সওয়েল সাহেবের গলার স্বর ধীরে ধীরে চড়তে লাগলো। রসুল মিঞা বহুদিনের পোড়খাওয়া ব্যবসায়ী, তিনি জেনেশুনে ধান্দায় নুকসান কিছুতেই মেনে নিলেন না। ফিরিঙ্গি সাহেবকে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন যে কোম্পানির লোক বলে তাঁকে কোনো অগ্রাধিকার তিনি দিতে পারবেন না, যে ক্রেতা তাঁকে কাপড়ের বেশী দর দেবে তাকেই তিনি তাঁর মাল বেচবেন। তাঁর একথা শুনে সাহেবের জাত্যাভিমানে আঘাত লাগলো। তাঁর ইচ্ছা হল সামনের নরকের কীটটিকে তখনই মেরে মাটিতে পুঁতে দিতে। কিন্তু রসুল মিঞার পরিচিতির কথা ভেবে তিনি তাঁর আক্রোশ মনের ভিতরেই চেপে রাখলেন। আর কথা না বাড়িয়ে তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। বাজার ছেড়ে বেরোনোর পথে এক হতভাগ্য ভিক্ষুক তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে এল। ম্যাক্সওয়েল সাহেবের মনের ভিতর জমে থাকা চাপা আক্রোশ গিয়ে পড়লো সেই দীনদুঃখীর উপর। দুর্বৃত্ত ফিরিঙ্গি সেই হতভাগ্যকে রাস্তায় ফেলে প্রচণ্ড প্রহার করতে লাগলো। সেই অসহায়ের আর্তনাদে বাজারের সব লোক সেখানে ছুটে এল, কিন্তু ফিরিঙ্গির পাতলুনে গোঁজা তরবারি দেখে কেউই আর কিছু বলতে সাহস পেল না।
হতভাগ্য ভিক্ষুকের যখন প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থা, তখন সমবেত জনতার ভিতর থেকে খাঁড়া হাতে এগিয়ে এল এক যুবক। তার পরনে খাটো লুঙ্গি, তার অনাবৃত গায়ের জায়গায় জায়গায় রক্তের ছিটে। দেখে যে কেউ বলে দেবে যে সে এক কসাই। প্রতিদিন বহু নিরীহ প্রাণের রক্ত ঝরিয়ে সে তার জীবিকা নির্বাহ করে। তার চোখের চাহনিতে, অনাবৃত অঙ্গের উদ্ধত পেশীতে সেই পাশবিক জীবিকার ছাপ স্পষ্ট। তার অবস্থা দেখে মনে হয় বুঝি সোজা জাহান্নাম থেকে নেমে এসেছে! তবে বাজারের সব ব্যাপারী তাকে বেশ ভাল করেই চেনে, কসাইয়ের নাম ইসমাইল। বাজারের ঠিক বাইরেই তার কসাইখানা।
ইসমাইলের প্রচণ্ড রণমূর্তি দেখে ম্যাক্সওয়েল সাহেবও ভয় পেলেন। তিনি তখন সেই ভিক্ষুককে ছেড়ে দিয়ে ইসমাইলের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। ইসমাইলের সাথে চোখাচোখি হতেই সাহেবের মনের ভাব পরিবর্তিত হল। সমবেত জনতা ভেবেছিল যে এবার তাদের চোখের সামনে যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যে একটা তুমুল হাতাহাতি লেগে যাবে। কিন্তু সবাই তাজ্জব হয়ে দেখলো যে ফিরিঙ্গি সাহেব খালি ভ্রুকুটি করে ইসমাইলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলেন। ইসমাইলের ক্রোধ কিন্তু এতটুকু কমলো না। সে সাহেবের দিকে আরও দুই পা এগিয়ে গিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বললো – “কাফের ফিরিঙ্গি, ইহাসে দফা হো!” তার সেই হুঙ্কার শুনেও ম্যাক্সওয়েল সাহেবের মুখের ভাবে বিশেষ পরিবর্তন এল না। সাহেব আরও কিছুক্ষণ ইসমাইলের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। শেষে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্রূর হাসি নিয়ে তিনি সেই জায়গা থেকে বিদায় নিলেন। সমবেত জনতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো! একটা বড়সড় গণ্ডগোল এড়ানো গেছে ধরে নিয়ে তারা ভিক্ষুকের শুশ্রুশায় মন দিল। সেই বাজারের ব্যাপারীরা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে তাদের সামনেই সেই ফিরিঙ্গি দুর্বৃত্ত তাঁর মনের গভীরে কি ভয়ানক এক সওদার ছক কষে ফেললো! বাজার ছেড়ে হোয়াইট টাউন ফেরার পথে ম্যাক্সওয়েল সাহেবের মুনাফালোভী মন সেই গোপন সওদায় তাঁর সম্ভাব্য লাভের অঙ্ক কষতে লাগলো। তাঁর এই সওদা পাক্কা, কারণ তিনি দেখে ফেলেছেন বাজারের সেই কসাইয়ের বামহাতের বুড়ো আঙুলের লম্বা নখ!
৫
হাফিজ সাহেবের হাভেলির দালানে আবার বসেছে মুশায়রা। পর্দার আড়ালে যথারীতি উপস্থিত সেই বিশেষ শ্রোতা, আর সাধারণ দর্শকাসনে সেই ফিরিঙ্গি সাহেব। সাহেবের স্থির নজর সেই শ্রোতার উপর। মুশায়রা শেষ হলে, দুর্বৃত্ত ফিরিঙ্গি পিছু নিল সেই শ্রোতার। ব্ল্যাক টাউনের জেলেপাড়ার এবড়ো খেবড়ো পথ পেরিয়ে তারা হাজির হল পেন্নার নদীর তীরে এক ছোট মাটির কুঠুরির সামনে। আজ অমাবস্যার রাত, তাই চতুর্দিকে নিকষ কালো অন্ধকার। কুঠুরির ছোট জানালা দিয়ে প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় সাহেব দেখতে পেলেন যে ইসমাইল ঘরে প্রবেশ করে বোরখা ছেড়ে মাটির দেওয়ালের এক ছোট ছিদ্র থেকে সাবধানে বের করে নিল তার সেই সাধের কলম। তারপর প্রদীপের আলোয় গোটা রাত ধরে একমনে সে লিখে চললো তার আশ্চর্য প্রাণবন্ত শায়েরী। ভোররাতে সওদা পাকা করে ম্যাক্সওয়েল সাহেব জেলেপাড়া ছাড়লেন।
৬
ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাদ্রাস শহর পত্তনের পর প্রায় এক দশক কেটে গেছে। সালটা ১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দ, কোম্পানির অধীনস্থ একটি ছোট্ট শহর থেকে মাদ্রাস ক্রমে এক প্রেসিডেন্সীর মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। ফলে মাদ্রাসে কোম্পানির শাসন কাঠামোয় ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। কোম্পানির শাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য সেখানে প্রেসিডেন্ট ছাড়াও আরও অনেক নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এই পরিবর্তনের ফলে কোম্পানির কয়েকজন পুরানো কর্মচারী তাঁদের আগের গুরুত্ব হারিয়েছেন।
ম্যাক্সওয়েল টার্নার এখন তাঁদেরই একজন। এই এক দশকে তাঁর চুলে পাক ধরেছে, তাঁর দেহে দেখা দিয়েছে বার্ধক্য। সাহেব এখন দেশে ফেরার তোড়জোড় করছেন। দেশে ফেরার আগে জামাকাপড় ও অন্যান্য জরুরী জিনিসের সাথে তিনি তাঁর বাক্সে সযত্নে পুরে নিয়েছেন একটি কলম। সেই কলম যা তিনি এক অমাবস্যার রাতে এক হতভাগ্য শায়রের কুঠুরি থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন তার আসল পরিচয় গোপন রাখার শর্তে। সেদিন সেই দরিদ্র কসাইয়ের সর্বস্ব লুঠ করে ইংরাজের জাত্যাভিমানী মন বিজয়ীর দর্প অনুভব করেছিল। সেই দর্প আজ আর নেই। সেদিন যখন তিনি বাড়ী ফিরে দেখলেন যে লিখতে গেলে সেই কলম দিয়ে শুধু বুকের রক্ত ঝরে, তখন সেই কলমের প্রতি তাঁর পার্থিব আকর্ষণ পরিবর্তিত হয়ে গেল গভীর আত্মিক টানে। সেই আশ্চর্য কলমের সাহচর্যে মুনাফালোভী দুর্বৃত্ত ফিরিঙ্গির মনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এল।
এখন সেই কলম দিয়ে লিখতে গেলে তাঁর মনে কোথায় যেন বাঁধে। চিরকাল শুধু লাভ ক্ষতির অঙ্ক কষে আসা ব্যাপারী মনের গভীরে কোনো ছোট্ট কুঠুরিতে বাসা করে নিয়েছে সূক্ষ্ম পাপবোধ। সেই বিবেকদংশনে ম্যাক্সওয়েল সাহেব কলমটি আর ব্যবহার করে উঠতে পারেন না। কলমটি তাঁর নিজের হয়েও যেন তাঁর নিজের হয় না! শুধু মাঝে মাঝে কোনো অমোঘ টানে সাহেব কলমটি হাতে নিয়ে তার মাথার লম্বা সাদা পালকে হাত বুলিয়ে দেন আর লেখনীর ঠিক উপরে যে হালকা লাল দাগ আছে তার দিকে অবাক চোখে চেয়ে থাকেন।
সেন্ট জর্জ দুর্গ আর হোয়াইট টাউনে এখন সাজো সাজো রব। প্রেসিডেন্সীর মর্যাদা উৎযাপনের জন্য রাস্তায় রাস্তায় গোরা মানুষের ঢল। সারাদিন ধরে চলে তাঁদের নানা কর্মব্যস্ততা, তুমুল হট্টগোল। সেই কোলাহল শান্ত হয় গভীর রাতে গিয়ে। তখন গভীর রাতের সেই নিঃস্তব্ধ নির্জনতায় সেন্ট জর্জ দুর্গের পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ায় এক বদ্ধ উন্মাদ। চারিদিকে চেয়ে সে খালি এক ফিরিঙ্গি কাফেরকে খোঁজে আর আপন মনে শায়েরী আওড়ায়। থেকে থেকে সে তার মাথার ঘন অবিন্যস্ত চুলে হাত বোলায়, তখন স্পষ্ট দেখা যায় তার বাম হাতের বুড়ো আঙুলের সেই লম্বা নখ!
*************************
আগুনের আলো
১
গঙ্গাতীরের শ্মশানঘাট লোকারণ্য, একনাগাড়ে বেজে চলেছে খোল-করতাল, সাথে শোনা যাচ্ছে শাঁখের শব্দ আর ক্রমাগত উলুধ্বনি, বাতাসে ধূপধুনার গন্ধ। শ্মশানঘাটে এক মৃতদেহ সৎকারের প্রস্তুতি চলছে। মৃতব্যক্তি হরিনারায়ণ পাশের গ্রাম নীলকান্তপুরের জমিদার, জাতে কুলীন ব্রাহ্মণ, তায় কয়েকপুরুষ ধরে দিল্লীর মুঘল দরবারে বাঙলার পরিচিত মুখ। তাই মহা ঘটা করে মৃতদেহ সৎকারের প্রস্তুতি চলছে।
সুগন্ধি চন্দনকাঠ জড়ো করে প্রস্তুত করা হয়েছে চিতা, দাহ করার জন্য তাতে ঢালা হয়েছে ঘি। সেই চিতা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার পরিবারের লোকজন, নিকট আত্মীয়রা। সেই জটলার ভিতর থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে এক ক্ষীণ নারীকণ্ঠে কান্নার শব্দ। সেই নারী কুলীন জমিদারের পঞ্চম পক্ষের স্ত্রী যশোদা, তার বয়স সবে এক কুড়ি পেরিয়েছে। সে বিলাপ করছে আর থেকে থেকে ভয়ে জ্ঞান হারাচ্ছে। যশোদা জমিদারের সতী হতে চলেছে। জমিদারের আগের পক্ষের স্ত্রীরা সকলেই পরলোকগমন করেছেন, তাই পুণ্যলাভের এই সৌভাগ্য তার কপালেই জুটেছে। সমাজ ও পরিবারের রক্তচক্ষুর ভয়ে প্রথমে রাজী হলেও শ্মশানঘাটে পৌঁছে, নিজের ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে যশোদা মাঝে মাঝেই জ্ঞান হারাচ্ছে। তার আশেপাশের লোকজন নির্বিকার, সে যাতে পালাতে না পারে তাই পুণ্যলোভী মানুষের দল তাকে বৃত্ত করে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। জমিদার বংশের পুরোহিত একনাগাড়ে মন্ত্র পড়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সতীদাহের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন। সবার চিন্তা দেরী করলে যশোদা বুঝি ভয়েই মারা যায়! তা হলে সতীদাহের পুণ্যলাভের সুযোগ থেকে তারা সকলেই বঞ্চিত হবে। পুণ্যলাভের আশাতেই গ্রামের মানুষ যোগ দিয়েছে এই পাশবিক কর্মকাণ্ডে – যার নাম সতীদাহ।
সালটা ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসিত বাঙলায় কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে গ্রাম নীলকান্তপুর। ইংরাজদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে সেখানে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, সতীদাহের মত প্রথা হিন্দুসমাজে বহুল প্রচলিত। যদিও সরকার বাহাদুর সতীদাহ বন্ধ করার জন্য নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ মাদ্রাস প্রেসিডেন্সীতে সতীদাহের সময় ইংরাজদের হস্তক্ষেপের কয়েকটি ঘটনাও ঘটেছে। এই বছর খোদ কলকাতা শহরে সতীদাহের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে। এই নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বহু বাঙালিও। তবু কলকাতা শহরের বাইরে বাঙলার গ্রামগুলিতে এখনও প্রায়ই ঘটে চলেছে সতীদাহ।
নীলকান্তপুরের ঘটনা তারই জ্বলন্ত সাক্ষ্য। পুরোহিতের মন্ত্র পড়া শেষ হলে সকলে মিলে জোর করে যশোদাকে তুলে দিল চিতার উপর। ঠিক যেন বলির জন্য এক নিরীহ গবাদিকে বেঁধে দেওয়া হল যূপকাষ্ঠে। পুণ্যলোভী জনতা ঘিরে দাঁড়ালো সেই চিতা। শ্মশানের ডোম এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, এবার চিতায় আগুন ধরানোর জন্য তার ডাক পড়লো। সাক্ষাত যমরাজের মত যশোদার মৃত্যুর সমন নিয়ে সে জটলার ভিতর প্রবেশ করে চিতায় অগ্নিসংযোগ করলো। সাথে সাথে বেজে উঠলো খোল-করতাল, শুরু হল সমবেত জনতার উলুধ্বনি। সেইসব শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে গেল এক নিরপরাধ বিধবার জ্বলন্ত আগুন থেকে প্রাণে বাঁচার শেষ আর্তি।
দাহকার্য শেষ হলে গ্রামের মানুষ শ্মশানঘাটের পুণ্য কুড়িয়ে যে যার বাড়ী চলে গেল। তখন সেই শ্মশানের ডোম নিশিকান্ত চারপাশে আর কেউ নেই দেখে নিয়ে শ্মশানঘাটের এক বটগাছের তলা থেকে কুড়িয়ে নিল একটি ছোট্ট চটের থলি। থলির ভিতর রাখা ছিল চিতায় দেওয়ার জন্য জমিদারের কিছু প্রিয় জিনিস। নিশিকান্ত সেইসব কিছুই চিতায় দিয়েছে, শুধু রেখে দিয়েছে একটিমাত্র জিনিস। থলির ভিতর এক নজর চালিয়েই জিনিসটা ডোমের মনে ধরেছিল। মনে হয়েছিল জিনিসটা বিক্রি করে কয়েকদিনের খাবার আর দেশী মদের পয়সা সে ঠিক জোগাড় করে নেবে। তাই সবার অলক্ষে বটগাছের তলায় চটের থলির ভিতর সে লুকিয়ে রেখেছিল সেই জিনিসটি। এখন সুযোগ বুঝে থলির ভিতর থেকে সে হাতে তুলে নিল সেই কারুকার্যময় লেখার ডায়েরী।
২
নীলকান্তপুর গ্রামের ঠিক বাইরে গঙ্গাতীরের শ্মশানঘাট, আর শ্মশানের ঠিক পাশেই ডোমের মাটির কুঁড়েঘর। সেই ঘরে ডোম একাই থাকে। তার নাম নিশিকান্ত, কিন্তু গ্রামের মানুষ তাকে নিশি ডোম বলেই ডাকে। আশেপাশের গ্রাম থেকেও এই শ্মশানঘাটে মৃতদেহ আসে সৎকারের জন্য। গ্রামের মানুষ মনে করে গঙ্গাতীরের এই শ্মশানঘাট এক পুণ্যস্থান, এখানে দেহ সৎকার করলে মৃতব্যক্তি স্বর্গলাভ করে। নিশি ডোমের অবশ্য স্বর্গ-নরক নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই, দেহ সৎকারের পর ডোমের প্রাপ্য পয়সা পেলেই সে খুশী। সেই পয়সা দিয়েই সে খাবার আর দেশী মদ কিনে খায়। মৃতব্যক্তি বা তাঁর আত্মীয়স্বজনের প্রতি আলাদা করে কোনো টান সে অনুভব করে না। তবে মাঝে মাঝে মৃতব্যক্তির সাথে তাঁর কিছু প্রিয় জিনিসপত্রও আসে শ্মশানঘাটে। তখন সেই জিনিসপত্রের ভিতর থেকে দু একটা মুল্যবান জিনিস নিশি ডোম সরিয়ে ফেলে সবার অজান্তে। তারপর সেই জিনিসগুলো গ্রামের এক অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে বেচে সে দুপয়সা আয় করে। সেই পয়সায় তার বেশ কিছুদিন নিশ্চিন্তে চলে যায়। কারণ আশেপাশের গ্রামগুলিতে মানুষ তো আর রোজ মরে না! তাই সেইসব দুর্দিনের কথা ভেবে ডোম রোজগারের এই অন্য পথ খোলা রাখে!আজ যেমন সে নীলকান্তপুরের মৃত জমিদারের মূল্যবান ডায়েরী হাত করে নিল দুপয়সা রোজগারের আশায়। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সেই ডায়েরীটি সে খুঁটিয়ে দেখতে বসলো, যাতে পরেরদিন ব্যবসায়ীর কাছে সে তার ন্যায্য দর হাঁকাতে পারে।
নিশি ডোম লেখাপড়া জানে না। তাই তার কাছে ডায়েরীর লেখা মূল্যহীন। ডায়েরীর বাইরের সূক্ষ্ম কারুকার্যই সকালে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এখন ডায়েরীটা হাতে নিয়ে সে আন্দাজ করতে পারলো যে সেটা খুব সম্ভবতঃ দিল্লীর দরবার থেকে জমিদারের হাতে এসেছিল। সেই বাদশাহী ডায়েরীর বাইরের বাঁধানো মলাটে অপূর্ব কারুকার্য, ঠিক যেমনটি থাকে মিনে করা গয়নার বাক্সে। সেই ডায়েরীর প্রথম পাতা খুলতেই নিশিকান্তের চোখ যেন আগুনের আলোয় ঝলসে গেল। তার মনে হল তার চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। সে ভয়ে ডায়েরীর পাতা বন্ধ করে দিল। ডায়েরী বন্ধ করতেই তার চোখের সামনের সেই আগুন নিমেষে উধাও হল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে সে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। তার লেখাপড়া না জানা, সহজ সরল গ্রাম্য মন ডায়েরীর ভিতর অলৌকিক কোনো যোগ খুঁজে পেল। তারপর ধীরে ধীরে ডোম তার সম্বিৎ ফিরে পেল। তখন সেই বন্ধ ঘরের ভিতর একটা মিষ্টি গন্ধ তার নাকে এল। এই সুগন্ধ তার অচেনা নয়, শ্মশানঘাটে চিতা তৈরীর সময় মাঝে মাঝে এই গন্ধ তার নাকে আসে। সে টের পেল যে তার ঘর ভরে গেছে চন্দনের মিষ্টি সুবাসে আর সেই গন্ধ এসেছে সেই বাদশাহী ডায়েরীর ভিতরের পাতা থেকে!
৩
নিশি ডোম সেই বাদশাহী ডায়েরী হাতে পাওয়ার পর প্রায় দুমাস কেটে গেছে। নীলকান্তপুরে এখন ভরা শ্রাবণ। ভারী বর্ষায় গঙ্গা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বেড়ে ওঠা নদীর জলে ডুবে গেছে শ্মশানঘাটের সিঁড়ি। অবিরাম বৃষ্টিতে মাটি ভিজে নরম হয়ে শ্মশানের আশেপাশে গজিয়ে উঠেছে অনেক নতুন গাছপালা। গঙ্গার তীরের শ্মশানঘাট ঢেকে গেছে সবুজের চাদরে।
এই দুমাসে নিশিকান্তের মনেও এসেছে পরিবর্তন। সে এখন রোজ সেই ডায়েরীর পাতা খুলে বসে। এখন আর তার চোখ আগুনের আলোয় ঝলসে যায় না। সেই আলো এখন তার চোখে সয়ে গেছে। সে এখন একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেই আলোর দিকে। সেই আলোয় সে নিজের মনের ভিতরটা পরিষ্কার দেখতে পায়। সেই মনের গভীরেও ধিকধিক করে জ্বলে এক অন্য আগুন। নিজের সারা জীবনের কুকর্মের কথা ভেবে সেই আগুনে সে নিজেই দগ্ধ হয়। মনের ভিতর প্রায়শ্চিত্তের সেই আগুন একসময় প্রশমিত হয়। তখন তার চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ডায়েরীর পাতার উপর।
ডোমের ইচ্ছা হয় চন্দনের গন্ধমাখা আনকোরা সেই ডায়েরীর পাতায় কিছু লিখতে। কিন্তু লেখাপড়া না জানায় সে ইচ্ছা তার অপূর্ণই থেকে যায়। তখন তার মনে বাসনা জাগে লেখাপড়া শেখার, সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করার। শ্মশানঘাটে শবদাহ করার সময় ডোম এখন স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে জ্বলন্ত চিতার দিকে। আর মনে মনে কল্পনা করে তার নিজের শেষদিনগুলিকে। জীবনের সেই শেষ দিনগুলিতে নিজের একাকীত্বের কথা ভেবে ডোমের বুক কেঁপে ওঠে। তখন তার ইচ্ছা হয় কাউকে সঙ্গে পেতে, বাকী জীবনটা তার সাথে মিলে কাটাতে।
শ্মশানঘাট আবার লোকারণ্য, পাশের গ্রাম থেকে এক মৃতদেহ এসেছে সৎকারের জন্য। মৃতব্যক্তি কেউকেটা না হলেও জাতে কুলীন ব্রাহ্মণ। তাই মানুষ যথারীতি ভিড় জমিয়েছে সতীদাহের পুণ্যলাভের আশায়। এবার সত্তরোর্ধ মৃত কুলীনের সতী তাঁর সপ্তম পক্ষের স্ত্রী ইন্দুবালা! ইন্দুবালা কিশোরী, নিজের যে সর্বনাশ হতে চলেছে তা বোঝার মত পরিণতিবোধ তার জন্মায় নি। মানুষের জটলার মাঝে সে হতভম্ব হয়ে বসে আছে আর কিশোরী মনের কৌতূহল নিয়ে তার ডাগর ডাগর চোখ দুটি মেলে চারপাশটা দেখে চলেছে। সে বুঝতে পারছে যে হঠাৎ কোনো কারণে সে সবার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কিন্তু এই গুরুত্ব পাওয়ার সঠিক কারণটা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। শ্মশানঘাটে পুরোহিতের মন্ত্র পড়া শেষ হলে ইন্দুবালার কপালে সিঁদুরের লাল রঙের বড় টিপ পরিয়ে দেওয়া হল। ইন্দুবালা সাজতে ভালবাসে, বিয়ের আগে বাপের বাড়ীতে তার মা তাকে সন্ধ্যাবেলায় এরকমই সিঁদুরের টিপ পরিয়ে সাজিয়ে দিতেন। সে তাই সিঁদুরের টিপ পরে মনে মনে ভারী খুশী হল। তারপর সকলে মিলে ঘিরে ধরে তাকে নিয়ে চললো চিতার দিকে।ইন্দুবালার চঞ্চল কিশোরী মন ভাবলো বোধয় নতুন কোনো খেলার আয়োজন চলছে। সে মহা আনন্দে তার ডান গালের টোল পড়া হাসি হাসতে হাসতে এগিয়ে চললো তার করুণ পরিণতির দিকে।
নিশি ডোম এতক্ষণ দূর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। ভরা শ্রাবণের আকাশের মতই তার মনেও আজ মেঘ জমছিল। এক নিষ্পাপ কিশোরীর এই করুণ পরিণতি সে মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। সে বুঝতে পারছিল যে তার মনের ভিতর একটা প্রচণ্ড তোলপাড় চলছে। সমাজের এই নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে সরব হওয়ার জন্য জীবনে প্রথমবার সে অন্তর থেকে একটা তাগিদ অনুভব করছিল। কিন্তু এত লোকের মাঝে একার লড়াই জেতার জন্য নিশিকান্তের দরকার ছিল একটা সাহায্যের হাত। সেই সাহায্যের হাত সেদিন বাড়িয়ে দিলেন স্বয়ং ভগবান!
ইন্দুবালাকে চিতায় তোলার পর সমবেত জনতার চাপে নিশিকান্ত চিতায় অগ্নিসংযোগ করলো। কিন্তু চিতা ভালো করে ধরার আগেই শ্মশানঘাটে মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। সেই প্রবল বৃষ্টিতে সমবেত জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে গ্রামের দিকে পালাতে লাগলো। অবিরাম বৃষ্টির জলে চিতা গেল নিভে। নিশিকান্ত যেন ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করেছিল। ইন্দুবালাকে সে চিতা থেকে নামিয়ে সবার চোখের আড়ালে নিজের কুঁড়েঘরে নিয়ে গেল।
বৃষ্টি থামলে জনতা শ্মশানঘাটে ফিরে এসে দেখলো যে চিতা নিভে গেছে, ইন্দুবালাও আর নেই। তখন তারা শ্মশানঘাটের ডোমকে তলব করলো। ডোম এসে বয়ান দিল যে সে বাকী সকলের মত বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ঘরে ফিরে গিয়েছিল, ইন্দুবালার হদিশ সে রাখেনি। তার একথা শুনে সবার মনে আশঙ্কা হল যে সেই চঞ্চল কিশোরী হয়তো তবে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গঙ্গাঘাটের দিকে দৌড় লাগিয়েছিল, পুণ্যবতী গঙ্গাই তাকে গ্রাস করেছেন! শ্মশানঘাটের আশেপাশে ইন্দুবালার কোনো খোঁজ না মেলায় সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে বলে সকলে মেনে নিল। পুণ্যলাভের এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় সকলেই তখন হা হুতাশ করতে করতে শ্মশানঘাট ত্যাগ করলো। কেবল একা নিশি ডোম মৃতদেহের চিতায় আবার অগ্নিসংযোগ করে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেই জ্বলন্ত চিতার দিকে।
৪
নিশিকান্ত ইন্দুবালাকে চিতা থেকে উদ্ধার করেছিল তার অন্তরের তাগিদে। এর পিছনে নিজের স্বার্থসিদ্ধির কোনো মতলব তার ছিল না। সেদিন ঘরে ফিরে নিশিকান্ত স্পষ্ট বুঝতে পারলো যে সেই অপরিণত কিশোরীকে গ্রামের মানুষদের রক্তচক্ষু থেকে আড়াল করতে হবে, নইলে অনাচারের দায়ে সেই কিশোরীর সাথে তার নিজেরও প্রাণ যাবে।
মৃতব্যক্তিদের জিনিসপত্র বিক্রি করে তার যে যৎসামান্য সঞ্চয় হয়েছিল, তা দিয়ে সে নীলকান্তপুরের হাট থেকে ইন্দুবালার জন্য নতুন কাপড় কিনে আনলো। নতুন কাপড়েও পাশের গ্রামের লোক ইন্দুবালাকে চিনে ফেলতে পারে। তাই ডোম এক অভিনব উপায় বের করলো। একদম কাকভোর আর সূর্যাস্তের পর ছাড়া ইন্দুবালাকে সে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করলো। শ্মশানঘাট বলে ভয়ে সূর্যাস্তের পর আর সূর্যোদয়ের আগে গ্রামের লোক সচরাচর ডোমের বাড়ীর দিকটা এড়িয়েই চলতো। এতে ডোমের একপ্রকার সুবিধাই হল।
অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য নিশিকান্ত হাট থেকে ভুসাকালি কিনে এনে ইন্দুবালাকে দিল। আর বললো – “মন দিয়ে শোন ছুঁড়ি, যদি প্রাণে বাঁচতে চাস্ তো ভিটা ছেড়ে বেরোনোর সময় এই কালি মুখে লেপে নিবি! পথে যদি কেউ দেখে ফেলে, তখন বড় করে মুখের জিভ বের করে তার দিকে ঐ ডাগর ডাগর চোখ মেলে চাইবি, ঠিক যেমন মা চামুণ্ডা চেয়ে থাকেন! এই শ্মশান এলাকায় চামুণ্ডা মূর্তি দেখলে আর কেউ কাছে আসতে সাহস পাবেনি!” কিশোরী ইন্দুবালা সেই অশিক্ষিত ডোমের মতলব কতটা বুঝলো সে নিজেই জানে। কিন্তু মুখে কালি মাখার নির্দেশে সে ভারী মজা পেল। এক নতুন খেলার সন্ধান পেয়ে আনন্দে উত্তেজনায় তার ডাগর ডাগর চোখ দুটি আরও বড় হয়ে উঠলো। ডোমের কথায় সে হাসতে হাসতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তখন নিশিকান্তের চোখে পড়লো ইন্দুবালার ডান গালের টোল। ডোমের চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার শৈশবের আবছা স্মৃতি।
ঘন বনের ভিতর দিয়ে একটি ছোট্ট ছেলে তার মা বাবার সাথে গ্রামে ফিরছে। ডোম বলে তাদের গরুর গাড়ীতে ওঠা নিষেধ। তাই ছোট বাচ্চাকে নিয়েও তাদের পায়ে হেঁটেই এতটা দূরত্ব পার করতে হয়। বনে ডাকাতের ভয় আছে জেনেও জীবনের এত বড় ঝুঁকি নিতে হয়! পূর্ণিমার রাত, মা বাবা পাশাপাশি হেঁটে চলেছেন। মার কোলে ছোট্ট ছেলেটি। সে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে মায়ের মুখের দিকে, কারণ অন্যদিকে চাইলেই অন্ধকার বন, তার ভয় করছে! বাবার কোনো কথায় মা হাসলে, পূর্ণিমার আলোয় তার ডান গালে ফুটে উঠছে টোল! ছোট্ট ছেলেটি অবাক চোখে চেয়ে দেখছে তার মায়ের গালের সেই টোল, গালের চামড়ার সেই ভাঁজেই যেন লুকিয়ে আছে তার মায়ের সত্তা, তার শিশুমনের সবথেকে বড় নির্ভরতা। সেই ভয়ঙ্কর রাতে ডাকাতদের হাতে সবকিছু হারানোর আবছা স্মৃতি এখনও ডোমের চোখে মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে।
ইন্দুবালার ডান গালের টোলে নিশিকান্ত যেন আনেকদিন আগে হারিয়ে যাওয়া কাউকে ফিরে পেল। তার মনে হল এই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সাথে তার না জানি কতদিনের পুরানো সম্পর্ক। জীবনে এই প্রথমবার কোনো কিছু ফিরে পাওয়ার জন্য সে মন থেকে বিধাতাকে ধন্যবাদ জানালো। জীবনের বাকী দিনগুলি ইন্দুবালার সাহচর্যে কাটানোর সুখস্বপ্ন চোখে নিয়ে সে আনন্দে দিন কাটাতে লাগলো।
গঙ্গাতীরের শ্মশানঘাটে মেঘ ভেঙে পড়ার পর প্রায় দুমাস কেটে গেছে। বর্ষার কালো মেঘ সরে গিয়ে নীলকান্তপুরে দেখা দিয়েছে ঝকঝকে শরতের আকাশ। মা আসছেন! গ্রামে গ্রামে শুরু হয়ে গেছে শারদীয়ার প্রস্তুতি। শ্মশানঘাটের গঙ্গার তীর ছেয়ে গেছে সাদারঙের কাশফুলে।
নিশি ডোমের জীবনে অবশ্য মা এসেছেন দুমাস আগেই! সেই সম্পূর্ণ অপরিচিত কিশোরীর মধ্যেই ডোম খুঁজে পেয়েছে তার জীবনের সার্থকতা। অতি অল্পসময়ের মধ্যেই নিশিকান্ত ও ইন্দুবালার ভিতর গড়ে উঠেছে এক অকৃত্তিম স্নেহের সম্পর্ক। ইন্দুবালা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে নিশি ডোমের আদরের ইন্দু মা! সেই ডায়েরীর আগুনের আলো ডোমকে পরিবর্তনের যে পথ দেখিয়েছিল, সেই পথে চলেই সে খুঁজে পেয়েছে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দুটি জিনিস – স্নেহ আর সাহচর্য।
ইন্দুও ফিরে পেয়েছে বাপ মায়ের ভালবাসা। বিয়ের আগে এক অতি সাধারণ গ্রাম্য পরিবারের মেয়ের কাছে যা ছিল তার প্রধান সম্বল। তার বাপ মায়ের ইচ্ছা ছিল তাকে লেখাপড়া শেখানোর। সমাজের রক্তচক্ষু এড়িয়ে ঘরের ভিতরেই বাবার কাছে সে তার লেখাপড়ার প্রথম পাঠ শুরু করেছিল। কিন্তু তারপর এক বর্ষায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবে ইন্দু তার বাবা মাকে হারালো। সেই সাথে তার লেখাপড়া শেখার স্বপ্নও অধরাই রয়ে গেল। প্রতিবেশীরা মিলে সকলের গলগ্রহ হয়ে পড়া বাচ্চা মেয়েটিকে বেঁধে দিল সত্তরোর্ধ এক কুলীনের গলায়। কিন্তু লেখাপড়া শেখার ইচ্ছা এখনও লুকিয়ে আছে ইন্দুর মনে।
গঙ্গাতীরের শ্মশানঘাটের জীবন সেই একইরকম আছে। সেখানে আগের মতই সতীদাহের ঘটনা এখনও ঘটে চলেছে। তবে মৃতদেহের সৎকার ছাড়া গ্রামের লোক আজকাল আর এদিকের পথ মাড়ায় না। কারণ লোকমুখে শোনা যায় যে গ্রামের দু একজন নাকি সন্ধ্যাবেলায় এই পথ দিয়ে যেতে গিয়ে সাক্ষাত দেবী চামুণ্ডার দর্শন লাভ করেছে! লোকমুখে এও শোনা গেছে যে শ্মশানঘাটে দেবী জাগ্রত বলে গ্রামের মানুষ দুর্গাপূজার পর সেখানে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নিয়ে ফেলেছে!
৫
পাদ্রীর নাম জোসেফ জেফারসন। সুদূর ইংল্যান্ডের সাসেক্স অঞ্চল থেকে তিনি খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারে ভারতবর্ষে এসেছেন। ইতিমধ্যে এদেশের নানা প্রান্তে ঘুরে তিনি এসে পৌঁছেছেন বাঙলায়। ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে সমাজের নানা সংস্কারমূলক কাজে অংশগ্রহণ করাও তাঁর উদ্দেশ্য। পরাধীন দেশে সমাজের বুক থেকে নানা কুসংস্কারের কালিমা মুছে ফেলতে তিনি বদ্ধপরিকর। বাঙলায় পৌঁছেই তিনি সতীদাহ, বাল্যবিবাহের মত প্রথার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। পাদ্রী সাহেব উপলব্ধি করেছেন যে সমাজের সর্বস্তরে শিক্ষার আলো না পৌঁছালে সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করা যাবে না। তাই তিনি বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়েছেন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ ও মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তারে। সেই লক্ষ্যেই তিনি এসে উপস্থিত হয়েছেন নীলকান্তপুরে।
এদিকে শ্মশানঘাটে মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা নিশিকান্তের কানেও গেছে। দেবী চামুণ্ডার মন্দির প্রতিষ্ঠা হলে যে শ্মশানঘাটে প্রচুর ভক্তের সমাগম হবে সে কথা নিশি ডোম বিলক্ষণ বুঝেছে। সেক্ষেত্রে ইন্দুকে যে আর আড়াল করা সম্ভব হবে না একথাও সে ভালভাবেই বুঝতে পারছে। তাই দিনে দিনে ডোমের মনে দুশ্চিন্তার মেঘ ঘনিয়ে আসছে। তার মন বলছে যে তার জীবনে আবার একটা সর্বনাশ হতে চলেছে।ইন্দুর জন্য আজকাল তার ভারী চিন্তা হয়। তার কথা শুনে ডোম বুঝতে পারে যে সে লেখাপড়া জানা ঘরের মেয়ে। ইন্দুর মনে যে এখনও লেখাপড়া শেখার সুপ্ত বাসনা লুকিয়ে আছে একথাও সে স্পষ্ট বুঝতে পারে। তার সেই বাদশাহী ডায়েরীতে কিছু লেখার জন্য যে ইন্দুর হাত নিশপিশ করে তাও ডোম সহজেই অনুমান করতে পারে। নিশিকান্তের অন্তরে হঠাৎ জেগে ওঠা এক বাপের মন তার মেয়ের সকল ইচ্ছা পূরণ করতে চায়। কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষুকে সে ভয় পায়। এই বয়সে এসে সে তার জীবনের শেষ সম্বল দুটি হাতছাড়া করতে চায় না। নিজের স্বার্থ আর এক বাপের মনের অপত্য স্নেহের টানাপড়েনে সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন ডোম সেই ডায়েরীর পাতা খুলে বসে। সেই আগুনের আলোর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে সে চেষ্টা করে তার মনের ভিতর সঠিক পথটি খুঁজে নিতে।
ইতিমধ্যে ইন্দু এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। একদিন কাকভোরে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার সময় সে মুখে কালি লেপতে ভুলে গিয়েছিল। সেই দিনটা ছিল মহালয়া। গুটিকয়েক পুণ্যার্থী সেদিন ঘাটে এসেছিল পিতৃপুরুষের তর্পণ সারতে। তারা ভোরের আবছা আলোয় ইন্দুকে দেখে ফেলে। ইন্দু গোটা ঘটনার কথা ডোমকে জানিয়েছে। নিশিকান্তের মনে আশঙ্কার মেঘ ক্রমে ঘনিয়ে উঠছে। সে বুঝতে পারছে যে হাতে সময় আর বেশী নেই।
এইসব আশা-আশঙ্কার মধ্যেই মহাধুমধামে শুরু হয়ে গেল দুর্গাপূজা। জগজ্জননীর আগমনে নীলকান্তপুর ও তার আশেপাশের গ্রামের লোকজন উৎসবে মেতে উঠলো। বছরের এই সময়টাই এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামের মানুষের ঘরে যায়, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে, একে অপরের ঘরের দালানে বসে নানা গল্পগুজব করে। সেই গল্পগুজবের মধ্য দিয়েই সে বছর ডোমের ঘরে ইন্দুবালার উপস্থিতির খবর চারিদিকে চাউর হয়ে গেল। উৎসবের দিনে কোনো খবর এক কান থেকে পাঁচ কান হতে বেশী সময় লাগে না! এই অনাচারের খবরে চারিদিকে রিরি পড়ে গেল। কিন্তু কেউই ইন্দুবালার খবর জানাজানি হয়ে যাওয়ার কথা ডোমের কান অবধি পৌঁছাতে দিল না। সবাই ভাবলো যে ডোমের কানে খবর পৌঁছালে সে ইন্দুবালাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। গ্রামের মানুষ সবাই মিলে ঠিক করলো যে তারা একেবারে অতর্কিতে ডোমের কুঁড়েঘর ঘেরাও করবে, যাতে সেই অনাচারী ম্লেচ্ছটা পালাবার পথ না পায়। তারপর সেই নেমকহারাম ইতরটাকে আর তার সাথের ঐ কুলটা মেয়েছেলেটাকে তারা আচ্ছা করে শায়েস্তা করবে।
গ্রামের মানুষের এই গূঢ় অভিসন্ধির কথা নিশিকান্ত কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পেল না। পূজার দিনে গ্রামে সে এমনিতেই ব্রাত্য। তবু এবছর বিজয়ার দিন মাকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে ডোম নীলকান্তপুর গ্রামের পথে রওনা হল।
গঙ্গাতীরের শ্মশানঘাটে বিজয়া দশমীর রাত। আশেপাশের গ্রামের প্রতিমা গঙ্গাবক্ষে নিরঞ্জন হয়ে গেছে। আলোকোজ্জ্বল উৎসবমুখর উদযাপনের পর চারিদিকে বিসর্জনের বিষন্নতা। সেই বেদনাবিধুর অনুভূতি গঙ্গাতীরের শ্মশানঘাটকেও যেন গ্রাস করেছে। শ্মশানঘাটের চারিদিকে এক অদ্ভূত নিঃস্তব্ধতা। গঙ্গাবক্ষের নিকষ কালো অন্ধকারের মাঝে খালি জ্বলজ্বল করছে শ্মশানঘাটের এক উজ্জ্বল আলোকবিন্দু। সেখানে দাউদাউ করে জ্বলছে নিশি ডোমের কুঁড়েঘর। গ্রামের মানুষ ষড়যন্ত্র করে উৎসবের একেবারে শেষপ্রহরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে অনাচারী ম্লেচ্ছটার ঘরে। দেখতে দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল মাটির সেই কুঁড়েঘর আর তার ভিতরের সকল জীবিত প্রাণ।
যে মানুষটি সারা জীবন গ্রামের মানুষদের শেষ যাত্রার জন্য চিতা প্রস্তুত করেছিল, আজ গ্রামের মানুষ সেই মানুষটিরই চিতা প্রস্তুত করে তার ঋণ চুকিয়ে দিল!
একসময় আগুনের সেই আলো নিভে এল। তখন সেই নিভু নিভু আলোয় গঙ্গার বুকে ভেসে উঠলো মা দুর্গার মুখ!
৬
ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল শহরের এক সভাগৃহ। সেখানে নারীশিক্ষা নিয়ে বক্তব্য রাখছেন রাজা রামমোহন রায়। সময়টা ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ, জানুয়ারী মাস। রাজা রামমোহন একজন ভারতীয় সমাজসংস্কারক। ভারতবর্ষে থাকাকালীন তিনি সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, বর্ণপ্রথার মত সামাজিক আচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এই মহাজ্ঞানী পুরুষ হিন্দুশাস্ত্র ঘেঁটে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে সতীদাহের মত প্রথা অশাস্ত্রীয় ও অসামাজিক। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথাকে বেআইনী ঘোষণা করেছেন। রক্ষা পেয়েছে বহু নিরপরাধ বিধবার প্রাণ। রাজা রামমোহন একজন শিক্ষাবিদও, নারীশিক্ষা প্রসারে তাঁর প্রবল সমর্থন রয়েছে। তাই নারীশিক্ষা নিয়ে বক্তব্য রাখতে তাঁকে এই সভাগৃহে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সভায় উপস্থিত ব্রিটিশ সমাজের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন ইংরাজী সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা। উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে মাঝের সারিতে বসে আছেন এক মহিলা সাংবাদিক। তাঁর পরনে কালো রঙের গাউন আর মাথায় কাজ করা বাহারী টুপি। রাজা রামমোহন অত্যন্ত সুবক্তা, গুরুগম্ভীর বিষয়ের মাঝে মাঝে তিনি অনায়াসে লঘুরস মিশিয়ে দিতে পারেন। সেইরকমই এক মুহূর্তে উপস্থিত শ্রোতারা সব হো হো করে হেসে উঠলেন, সভাগৃহ ফেটে পড়লো করতালির শব্দে। আর মাঝের সারিতে বসে থাকা সেই মহিলা সাংবাদিকের মুখের হাসিতে ফুটে উঠলো তাঁর ডান গালের টোল!
সেই মহিলা সাংবাদিকের নাম এমিলিয়া জেফারসন। তিনি সাংবাদিকতা করেন সাসেক্স অঞ্চলের এক সংবাদপত্রে। এমিলিয়া তাঁর কাজের মাধ্যমে মূলতঃ সমাজের ঘুণ ধরে যাওয়া প্রথাগুলিকে তুলে ধরতে সাহায্য করেন। অবসর সময়ে তিনি শিক্ষকতা করেন সাসেক্স অঞ্চলের একটি মেয়েদের স্কুলে। সেখানে গরীব মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
এমিলিয়া তাঁর জীবনের প্রায় পঞ্চাশটি বসন্ত অতিক্রম করে আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেছেন। সেই আত্মজীবনীতে তিনি তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের নানা কাহিনী লিপিবদ্ধ করেছেন। সেই কাহিনী পড়লে জানা যাবে যে কিভাবে তাঁর পালকপিতা নিজের স্বার্থ ভুলে, মেয়ের বাকী জীবনের কথা ভেবে তাঁকে তুলে দিয়েছিলেন এক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকের হাতে। সেই ধর্মপ্রচারকের নাম ছিল পাদ্রী জোসেফ জেফারসন! সেই দিনটা ছিল এক উৎসবের শেষদিন, পালকপিতা তার আদরের ইন্দুকে নিয়ে সেদিন দুপুর দুপুর পৌঁছে গিয়েছিলেন নীলকান্তপুরে পাদ্রী জেফারসনের ঠিকানায়। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই ম্লেচ্ছ পিতা সেদিন তার কন্যাসমা কিশোরীর প্রাণরক্ষা করেছিল। বিদায়ের আগে তার আদরের ইন্দুর হাতে সে তুলে দিয়েছিল তার জীবনের শেষ সম্বল – সেই বাদশাহী ডায়েরী! সে ভেবেছিল যে সে হয়তো আর থাকবে না, কিন্তু সেই ডায়েরীর আগুনের আলোই তার আদরের ইন্দুকে জীবনে সঠিক পথ দেখাবে।
এমিলিয়ার কাজের ঘরে টেবিলের বামদিকের ড্রয়ারে এখনও সযত্নে রাখা আছে সেই বাদশাহী ডায়েরী। সেই ডায়েরীর পাতা খুললে এখনও চোখের সামনে জ্বলে ওঠে আগুন আর ঘর ভরে যায় চন্দনের মিষ্টি গন্ধে। এমিলিয়া স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সেই আগুনের দিকে। এমিলিয়া এখন ব্যস্ত, পরের মাসেই প্রকাশিত হবে তাঁর সেই আত্মজীবনী যার নাম “দ্য লাইট অফ ফায়ার” (আগুনের আলো)!
***************************
বসরাই এ বাহার
১
সপ্তাহের শুরুতেই মাথায় হাত! শাহী হাম্মামের জন্য গোলাপ কম পড়ছে। দিল্লীর লাল কিলার ভিতর দেওয়ান-ই-খাসের উত্তরে শাহী হাম্মাম। সেখানে গোসল করেন স্বয়ং মুঘল সম্রাট ও তাঁর পরিবারের লোকজন। মার্বেল পাথরের উপর অপূর্ব কারুকার্য করে তৈরী সেই হাম্মামের দেওয়াল, তার উপরের ছাদ গম্বুজাকৃতির। সেই ছাদে লাগানো রঙিন কাঁচের ভিতর দিয়ে আলো ঠিকরে পড়ে গোটা হাম্মামে এক মোহময়ী পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেই শাহী হাম্মামের তিনটি ভাগ- সজ্জাঘর, সর্দখানা(ঠাণ্ডা ঘর) ও গর্মখানা(গরম ঘর)। প্রতিটি ঘরের কেন্দ্রস্থলে একটি করে ফোয়ারা, গোসলের সময় হাম্মামের ভিতরে লাগানো কল দিয়ে বেরিয়ে আসে গোলাপজল। সেই শাহী হাম্মামের জন্য গোলাপের জোগান আসে লাল কিলা সংলগ্ন মুঘলদের নিজস্ব বাগান থেকে। তবে গরমের সময় সাধারণতঃ গোলাপের জোগান কমে যায়। তখন শাহী হাম্মামের জন্য দিল্লীর নানা প্রান্ত থেকে বেশী পয়সা খরচ করে গোলাপ খরিদ করতে হয়। আগে মুঘল সম্রাটদের ধন দৌলতের অভাব ছিল না। কিন্তু এখন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাপটে জাহাঁপনার সেই ক্ষমতাও নেই, আর শাহী খাজানার সেই অতুল বৈভবও নেই। কাজেই মুঘল রাজবংশের লোকজনকেও এখন পদে পদে আম আদমির মত হিসাব করে চলতে হয় আর প্রয়োজন হলে মুঘল আভিজাত্য ভুলে পুরানো দস্তুরের সাথে আপোষও করতে হয়।
এখন মে মাস, দিল্লীতে গর্মির সময়। তাই দিল্লীর বাজারে গোলাপের দাম চড়া।পয়সা বাঁচাতে তাই গোলাপ আসছে লাল কিলা সংলগ্ন মুঘলদের নিজস্ব বাগান থেকেই। কিন্তু দিল্লীর প্রচণ্ড গরমে সেই বাগানেও গোলাপের জোগান কম। শাহী হাম্মামের পরিচারিকার তাই মাথায় হাত। গোলাপের জোগান এত কমে গেলে যে শাহী হাম্মাম চালানোই দায় হবে! তাই জরুরী তলব গেছে সেই বাগানের মালী রামচরণের কাছে।
রামচরণ এমনিতে হাসিখুশী, শৌখিন মানুষ। বাগানে গোলাপের পরিচর্যা ছাড়া সে গোলাপের পাপড়ির নির্যাস দিয়ে আঁতর বানানোর কাজও দক্ষতার সাথে করে। সেই আঁতর বাজারে বেচে তার দুপয়সা উপরি রোজগারও হয়। তবে রামচরণ তার নিজের পরিবারের ব্যবহারের জন্য যে আঁতর বানায় তার কথাই আলাদা। সেই আঁতর বানাতে সে ব্যবহার করে শুধুমাত্র তার বাড়ীর বাগানের এক বিশেষ বসরাই গোলাপ। সেই গোলাপের খুশবু বাগানের বাকী সব গোলাপকে হার মানায়। সেই গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বানানো আঁতরের মেহেক আশেপাশের মানুষের মন ভাল করে দেয়।অল্পসময়ের জন্য হলেও তারা তখন তাদের যাবতীয় দুঃখকষ্ট ভুলে যায়। সেই আঁতরের গন্ধ যেন মানুষের মনে দাওয়াইয়ের কাজ করে। তবে সেই আঁতর রামচরণ কাউকে বেচে না। সেই আঁতরের সুগন্ধেই চারপাশের মানুষ রামচরণ আর তার পরিবারকে চিনতে পারে। ধনদৌলতের আভিজাত্য না থাকলেও সেই আঁতরের গন্ধকে সম্পদ করেই রামচরণ তামাম দুনিয়ায় তার পেহচান বানাতে চেষ্টা করে। তবে কেউ জানে না যে সেই বসরাই গোলাপ আসলে লাল কিলা সংলগ্ন মুঘল বাগানের। প্রচণ্ড গরমে মরে যেতে বসা দুঃস্থ সেই গোলাপ গাছটিকে রামচরণ তার নিজের বাড়ীতে নিয়ে গিয়েছিল পরিচর্যার জন্য। সেই দুঃস্থ গাছটি এখন সুস্থ হয়ে আবার তার পুরানো রূপ ফিরে পেয়েছে। সেই লাল রঙের গোলাপ এখন তার বাড়ীর বাগান আলো করে রাখে। বাড়ী গেলে সেই গোলাপের পাপড়ি দিয়ে রামচরণ সেই বিশেষ আঁতর বানায় যার নাম সে রেখেছে- বসরাই এ বাহার!
তবে জাহাঁপনাও রামচরণকে খুব পছন্দ করেন। বৃদ্ধ হয়ে গেলেও মুঘল সম্রাটের শৌখিন আদত এখনও বজায় আছে। এখনও মাঝে মাঝে রামচরণকে তলব করে তিনি বাগিচার গোলাপের খোঁজখবর নেন। গোলাপের প্রতি মুঘল সম্রাটদের মহব্বত বহুদিনের। সেই কবে মুঘল সম্রাট বাবর ভারতবর্ষে আসার সময় উট বোঝাই করে গোলাপ নিয়ে এসেছিলেন ফারগানা প্রদেশ থেকে। তাঁর সময় থেকেই দিল্লী ও তার আশেপাশে মুঘলদের নিজস্ব বাগিচা গড়ে উঠেছিল। পারস্য দেশের বাগিচার অনুকরণে তৈরী সেইসব বাগিচায় গোলাপের পাশাপাশি অন্যান্য ফুলও স্থান করে নিয়েছিল। সম্রাট বাবরের গোলাপ প্রীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি তাঁর চার কন্যার নামকরণের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রিয় ফুলের নাম মিশিয়ে দেন! তবে পরবর্তীকালে গোলাপ আর কেবল মুঘল সম্রাটদের শৌখিনতার প্রতীক হয়েই আবদ্ধ থাকে নি, তা জায়গা করে নিয়েছে মুঘলদের দৈনন্দিন জীবনেও। মুঘল রসনার নানা পদেও ব্যবহৃত হয়েছে গোলাপের পাপড়ি, গোলাপজল। এই ফুলটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে মুঘল জীবনযাত্রার সাথে। শাহী হাম্মাম তারই এক উদাহরণ।
শাহী হাম্মামের পরিচারিকা ফিরদৌসী বেগম রামচরণের সাথে দেখা করে উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন – “রামু, এ কি শুরু করেছ বল তো! বাগিচা থেকে গোলাপের জোগান এত কমে গেলে শাহী হাম্মাম চালাই কি করে? গোলাপজল ছাড়া শাহী হাম্মাম যে অধুরা! শেষে তোমার গোলাপের জন্যই আমার গর্দান যাবে দেখছি!” রামচরণ তখন আমতা আমতা করে জবাব দিল – “আজ্ঞে বেগম, আপনি তো সবই জানেন। দিল্লীর এই শুষ্ক গরমে গোলাপ গাছ সব পুড়ে যেতে বসেছে। বারীশ না হলে এত গোলাপের জোগান আমিই বা দিই কি করে! তবে বেগম যদি অভয় দেন তো একটা ফিকির বাতলাতে পারি!” শুনে বেগম বললেন – “যাতে তোমার আমার গর্দান বাঁচে, এমন যে কোনো ফিকিরই আমি শুনতে রাজী!” তখন রামচরণ বেগমকে বুদ্ধি দিয়ে বললো – “আপনি তো জানেন যে আমি গোলাপের পাপড়ি দিয়ে আঁতর বানাই। আমার কাছে এবছর সর্দির সময় বানানো আঁতর আছে। যতদিন না গোলাপের ফলন ভাল হচ্ছে, আপনি শাহী হাম্মামের জলে খানিকটা সেই আঁতরও মিশিয়ে দিন। সেই আঁতরের এমনই উমদা খুশবু যে তার কয়েকফোঁটাতেই আপনার কাজ হাসিল হয়ে যাবে। তারপর গোলাপের জোগান বাড়লে, আঁতরের ব্যবহার বন্ধ করে দেবেন!” অন্য কোনো উপায় না দেখে বেগম সেই প্রস্তাবেই রাজী হলেন। দুপয়সা বেশী রোজগারের আশা মনে নিয়ে রামচরণ তার বাগানে ফিরে গেল। সমস্যা আপাততঃ মেটানো গেছে ভেবে বেগমও নিশ্চিন্তবোধ করলেন।
কিন্তু সমস্যা আসলে তখন যমুনা বেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল দিল্লীর দিকে! সেদিনের তারিখটা ছিল ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মে, দিনটা ছিল সোমবার!
২
মেরঠে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনানিবাস। সেখানে উপস্থিত দুহাজারেরও বেশী ব্রিটিশ সৈন্য আর প্রায় সমসংখ্যক ভারতীয় সেনা। সেখানে ইনফিল্ড রাইফেলের ব্যাবহার নিয়ে ভারতীয় সেনাদের মনে ঘোর অসন্তোষ। খবর মিলেছে যে সেই রাইফেলের কার্তুজে নাকি মেশানো হয়েছে গরু আর শূকরের চর্বি। সেই কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে রাইফেলে ভরতে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের ভারতীয় সৈন্যরাই নারাজ। কিন্তু সেই সেনা ছাউনীর উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অফিসাররা ভারতীয়দের এই ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি অসংবেদনশীল। তাঁরা বলপূর্বক ভারতীয় সৈন্যদের এই কার্তুজ ব্যবহারে বাধ্য করতে থাকেন। এতে ফল হয় বিপরীত। কুচকাওয়াজের সময় সবার সামনে ভারতীয় সেনারা দলবেঁধে এই কার্তুজ ব্যবহারের বিরোধিতা করে। শাস্তিস্বরূপ ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই মে, সেইসকল বিদ্রোহী সেনাদের দশ বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। জেলে পাঠানোর পূর্বে তাদের পায়ে শেকল পরিয়ে সেনা ছাউনীর সমস্ত সৈন্যদের সামনে দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অপমানজনক আচরণে ছাউনীর সমস্ত ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পরেরদিন ১০ই মে ছিল রবিবার, ছুটির দিন। সেদিন সন্ধ্যায় যখন অধিকাংশ উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অফিসাররা ছুটির মেজাজে সময় কাটাচ্ছিলেন, তখন মেরঠের বাজারে সিপাহী বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বিদ্রোহী সেনাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্দি ভারতীয়দের মুক্ত করা। কিন্তু মেরঠের বাজারে সেদিন আমজনতাও সেই বিদ্রোহে সামিল হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্রিটিশ জুনিয়র অফিসাররা বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করলে উন্মত্ত সিপাহী ও জনতা তাদের হত্যা করে। পরে তারা ব্রিটিশ অফিসার ও নাগরিকদের বাসস্থানগুলিতেও আক্রমণ করে। ব্রিটিশ অফিসারদের সাথে সাথে বহু সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকও প্রাণ হারায়। মেরঠের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ব্রিটিশদের হাতের বাইরে চলে যায়। ভারতবর্ষের ইতিহাসে রচিত হয় এক নতুন অধ্যায় যার নাম সিপাহী বিদ্রোহ। মেরঠ দখলে এনে বিদ্রোহী সেনারা কোনো যোগ্য নেতার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে। তখন তাদের মাথায় আসে দিল্লীর মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের নাম। তারা তখন নৌকায় করে যমুনা অতিক্রম করে দিল্লীর দিকে রওনা হয়। পরেরদিন তারা এসে উপস্থিত হয় দিল্লীর লাল কিলায়।
শাহী হাম্মামের জন্য আঁতর বেচে কত লাভ হবে তার হিসাব কষতে কষতে রামচরণ লাল কিলার ভিতরের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়লো যে একদল ভারতীয় সৈন্য উদ্ভ্রান্তের মত মুঘল সম্রাটের প্রাসাদের দিকে ছুটে চলেছে। তারা প্রাসাদের জানালার ঠিক নিচে পৌঁছে জাহাঁপনাকে উঁচুস্বরে নানারকম সম্বোধন করে ডাকতে লাগলো। মুঘল সম্রাটের কাছে প্রতিনিয়ত দর্শনপ্রার্থীদের ভিড় হয়। কিন্তু সেই সৈন্যদের আচরণ রামচরণের চোখে কেমন যেন গণ্ডগোলে ঠেকলো। সম্রাটের দেখা না পেয়ে সৈন্যদের গলার স্বর ক্রমে চড়তে লাগলো। রামচরণের ইচ্ছা ছিল ব্যাপারটার শেষ দেখে যেতে, কিন্তু তার মনে পড়লো ফিরদৌসী বেগম আর শাহী হাম্মামের কথা। দ্রুত আঁতর পৌঁছে দেওয়ার তাগিদে সে তখনকার মত তার মনের কৌতূহল দমন করে লাল কিলার দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
কিন্তু মনের কৌতূহল দূর করার জন্য তাকে আর বেশীদিন অপেক্ষা করতে হল না। ঠিক তার পরেরদিন অর্থাৎ ১২ই মে, বহুবছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে আবার বসলো মুঘল দরবার। শাহী হাম্মামের জন্য আঁতরের জোগান দিতে গিয়ে ফিরদৌসী বেগমের কাছে রামচরণ জানতে পারলো সিপাহী বিদ্রোহের কথা। প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে উঠে বৃদ্ধ মুঘল সম্রাট নাকি সেই বিদ্রোহ সমর্থনে সম্মতি দিয়েছেন। দেখতে দেখতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সেই বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মত গোটা দিল্লীতে ছড়িয়ে পড়লো। বহু ব্রিটিশ অফিসার, তাদের পরিবারের লোকজন ও বহু নিরীহ মানুষ এই বিদ্রোহের বলি হল। রামচরণ তার বাগানের ভিতর লুকিয়ে থেকে কোনোক্রমে নিজের প্রাণরক্ষা করলো। কিন্তু তার মনে স্ত্রী মোতিয়ার জন্য দুঃশ্চিন্তা ক্রমে বাড়তে লাগলো। সে কোনোভাবে দিল্লী থেকে বেরিয়ে তার বাড়ী লক্ষ্ণৌ এ পৌঁছানোর সুযোগ খুঁজতে থাকলো।
অবশেষে সেই সুযোগ মিললো এক শনিবারে, তারিখটা ছিল ১৬ই মে। কিন্তু সেদিন কিলা ছেড়ে বেরোনোর পথে সে সাক্ষী হয়ে রইলো এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের – কিলার বাইরে একটি পিপল গাছের তলায় মুঘল সম্রাটের কর্মচারীরা মিলে হত্যা করলো পঞ্চাশজন ব্রিটিশ বন্দিকে। সেই হত্যালীলা দেখে রামচরণের মনের ভিতর প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হল। মনের ভিতর সেই অস্থিরতা নিয়েই সে রওনা দিল লক্ষ্ণৌর পথে।
৩
গোমতী নদীর উত্তর-পশ্চিম তীরে লক্ষ্ণৌ শহর। সেখানেও জাঁকিয়ে বসেছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। লক্ষ্ণৌ অওধ রাজ্যের রাজধানী, একবছর আগেও এই রাজ্যের নবাব ছিলেন ওয়াজেদ আলি শাহ। কিন্তু বছরখানেক আগে অর্থাৎ ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁর রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছে। নবাবকে নির্বাসিত করা হয়েছে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ নামক এক অঞ্চলে। কোম্পানির এই আগ্রাসনে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ নবাবের পরিবারবর্গ ও লক্ষ্ণৌর আমজনতা। শোনা যায় নবাবের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী বেগম হজরত মহল নাকি গোপনে ব্রিটিশদের হাত থেকে অওধ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অওধ রাজ্যের বৃহত্তম শহর লক্ষ্ণৌ। এই শহরের কেন্দ্রস্থলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেসিডেন্সী যা আদতে কোম্পানির শাসন পরিচালনার প্রাণকেন্দ্র। গোটা অওধ রাজ্যে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক কাজকর্ম এই রেসিডেন্সী থেকেই পরিচালিত হয়। এই রেসিডেন্সীকে ঘিরেই ব্রিটিশ অফিসার ও নাগরিকদের বাসস্থান। সেইসব ঘরবাড়ীতে বাস করে বহু ব্রিটিশ পরিবার। সেইসকল পরিবারের গৃহকর্তা হয় উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মচারী নয়তো বা সেনাদলের অফিসার। সেইসব পরিবারের গৃহকর্ত্রীদের ঘরের দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য দরকার হয় পরিচারিকার। তখন সেইসব ধনী ব্রিটিশ পরিবার শহরের নিম্নবিত্ত দেশী পরিবারগুলির শরণাপন্ন হয়। সেইসব গরীব পরিবারের মহিলারা ব্রিটিশ পরিবারে পরিচারিকার কাজ করে অর্থ উপার্জন করে। সেইসকল পরিচারিকার বেতন হয়তো ব্রিটিশ পরিবারগুলির আয়ের তুলনায় অতি নগণ্য, কিন্তু সেই বেতনের বিনিময়ে যে গভীর প্রভুভক্তির পরিচয় তারা দিয়ে থাকে, তার মূল্য ব্রিটিশ পরিবারগুলির কাছে অপরিসীম!
লক্ষ্ণৌ শহরের সেইরকমই এক ব্রিটিশ পরিবারের কর্তা অ্যালেকজান্ডার স্মিথ। অ্যালেকজান্ডার শহরের জুনিয়র সেনা অফিসার। স্ত্রী অ্যানকে নিয়ে তাঁর ছোট সুখী পরিবার। অ্যালেকজান্ডার ও অ্যান গুটিকয়েক ইংরাজদের মধ্যে পড়েন যারা ভারতীয়দের সমান চোখে দেখে। সেই পরিবারে পরিচারিকার কাজ করে মোতিয়া, মালী রামচরণের স্ত্রী। মোতিয়ার সাথে সাহেব ও মেম দুজনেরই খুব ভাল সম্পর্ক। মোতিয়া তাঁদেরকে নিজের পরিবারের লোক বলেই মানে। অ্যান সন্তানসম্ভবা, মোতিয়া তাই তাঁর বিশেষ যত্ন নেয়। মোতিয়ার নিজের কোনো সন্তান নেই। এই বিশেষ সময়ে অ্যানকে তাই সে নিজের মেয়ের মতই আগলে রাখে। সেই ব্রিটিশ দম্পতিও তাঁদের সংসার পরিচালনায় মোতিয়ার অবদান অকপটে স্বীকার করেন। গোটা ভারতবর্ষে যখন ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের মধ্যে সংঘাত উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেইসময় গোমতী নদীর তীরে একটি ছোট্ট ব্রিটিশ পরিবারে এক ব্রিটিশ দম্পতি ও ভারতীয় পরিচারিকার মধ্যে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক বিশ্বাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
অ্যালেকজান্ডার কাজে বেরিয়ে গেলে অ্যান আর মোতিয়া মিলে জমিয়ে গল্প করে। অ্যান তাঁর ভাঙা ভাঙা হিন্দীতে মোতিয়ার পরিবার, তাদের দৈনন্দিন জীবন, তাদের আশা-আকাঙ্খা সবকিছুর খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। মোতিয়ার মুখে দেশের আম আদমির জীবনের সেইসব সহজ সরল কাহিনী শুনে অ্যানের মন বিস্ময়ে ভরে ওঠে। সে তখন তাঁর মনের ভিতর সেই সাদা-সিধা অনাড়ম্বর জীবনের স্বাদ পেতে চেষ্টা করে। তাঁর তখন মনে হয় হায়, এই জীবনে একবারের জন্যও যদি সে মোতিয়ার মত হতে পারতো!তাদের সেই গল্পগুজবে বেলা গড়িয়ে যায়। তারপর স্নানে যাওয়ার আগে মোতিয়া রোজ যত্ন করে অ্যানের চুল বেঁধে দেয়।
সেইসময় তারা অ্যানের গর্ভের সন্তানকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে নানা জল্পনা করে। মোতিয়া যখন অ্যানকে সেই সন্তানের চুলের রঙ কি হবে প্রশ্ন করে, অ্যান তখন সাদার পরিবর্তে কালো রঙকেই বেছে নেয়! অ্যালেকজান্ডারের চুল অধিকাংশ ইংরাজের মতই সাদা রঙের, কিন্তু অ্যানের মাথার ঘন কোঁকড়ানো চুলের রঙ কালো। অ্যান তাঁর মনের কোনো সুপ্ত বাসনায় তাঁর সন্তানের জন্যও কল্পনায় সেই কালো রঙকেই নির্বাচন করে।
বসরাই এ বাহারকে নিয়েও তাদের মধ্যে কথা হয়। মোতিয়ার গায়ের সেই আঁতরের সুবাস অ্যানের চারপাশটা এক মন ভাল করা অনুভূতিতে ভরিয়ে রাখে। সেই গন্ধ আর তার মানুষটাকে পাশে পেয়ে অ্যান তাঁর এই বিশেষ সময়ে নিজের পরিবারকে পাশে না পাওয়ার যন্ত্রণা ভুলে যায়। এইভাবে এক সামান্য পরিচারিকা হয়েও মোতিয়া অ্যানকে এক অভিভাবকের মত আগলে রাখে।
সেই ব্রিটিশ দম্পতির রাতের খাওয়া হলে তাঁদের ঘর গুছিয়ে দিয়ে তবে মোতিয়া বাড়ী ফেরে। সেদিন রাতে বাড়ী ফিরে মোতিয়া আবিষ্কার করলো যে দুঃশ্চিন্তার বোঝা ঘাড়ে করে সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছে তার স্বামী রামচরণ!
৪
রামচরণের মুখে সিপাহী বিদ্রোহের কথা শুনে মোতিয়াও চিন্তিত হয়ে পড়লো। দিল্লী থেকে লক্ষ্ণৌর দূরত্ব বেশী নয়। তাই তারা মনের ভিতর চাপা উদ্বেগ নিয়ে আশঙ্কার প্রহর গুণতে লাগলো।
দেখতে দেখতে সিপাহী বিদ্রোহের খবর ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়লো। ব্রিটিশদের অধীনস্থ ভারতীয় সেনাদের বহুদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন বাইরে বেরিয়ে আসার সঠিক পথ খুঁজে পেল। ভারতবর্ষের নানা জায়গায় জ্বলে উঠলো বিদ্রোহের আগুন। সেই আগুনের আঁচ এসে লাগলো লক্ষ্ণৌ শহরেও।
রামচরণ আর মোতিয়া অনেক আগেই সেই আগুনের আঁচ পেয়েছিল।দিল্লীর অভিজ্ঞতা থেকে রামচরণ অনুমান করতে পেরেছিল যে লক্ষ্ণৌতেও একটা কিছু ঘটতে চলেছে। শহরের আবহাওয়া ক্রমশঃ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। নানা কারণে ব্রিটিশদের প্রতি মানুষের মনে জমে থাকা রাগ স্ফুলিঙ্গ হয়ে ঝরে পড়ার সুযোগ খুঁজছিল।
লক্ষ্ণৌ রেসিডেন্সীর উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অফিসাররাও এই পরিবর্তন বুঝতে পেরেছিলেন। সেই শহরেও যে বিদ্রোহের বারুদ ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে তা তাঁরা বিলক্ষণ টের পেয়েছিলেন। অওধ নবাবের বেগমও যে পরিস্থিতিতে ইন্ধন জোগাচ্ছিলেন সে খবরও তাঁদের কানে পৌঁছেছিল। তাই চুপ করে বসে না থেকে তাঁরাও বিদ্রোহ প্রতিহত করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে রেসিডেন্সীর ভিতর জড়ো করা হয়েছিল দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার রসদ – খাবার, ওষুধ, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি। প্রয়োজনে শহরের সকল ব্রিটিশ নাগরিকদের আশ্রয় দিতে ঢেলে সাজানো হয়েছিল রেসিডেন্সীর পরিকাঠামোকে।
অবশেষে জমে থাকা সেই বারুদে অগ্নিসংযোগ হল, দিনটা ছিল ৩০ই মে, মুসলিম ধর্মালম্বীদের জন্য একটি পবিত্র দিন। সেইদিনই গোটা লক্ষ্ণৌ শহরে জ্বলে উঠলো সিপাহী বিদ্রোহের আগুন। সেইদিন বিদ্রোহী সিপাহীদের একটি দল দিল্লী থেকে লক্ষ্ণৌ এসে শহরে বিদ্রোহের মশাল জ্বালিয়ে দিল। মূলতঃ ভারতীয় সেনারাই বিদ্রোহের সূত্রপাত করলেও শহরের বহু সাধারণ মানুষও বিদ্রোহে সামিল হয়ে পড়লো। সেদিন লক্ষ্ণৌ শহরের রাস্তায় রাস্তায় উন্মত্ত জনতার রোষে বলি হল বহু ব্রিটিশ অফিসার ও নাগরিকের প্রাণ। কর্তব্যরত ব্রিটিশ জুনিয়র অফিসাররা বিদ্রোহ প্রাথমিক স্তরে প্রতিহত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিদ্রোহী সেনা ও আমজনতার মিলিত আক্রমণের সামনে তাদের প্রতিরোধ খড়কুটোর মত উড়ে গেল। নিহত হলেন কর্তব্যরত বহু ব্রিটিশ জুনিয়র অফিসার। তাদেরই একজনের নাম অ্যালেকজান্ডার স্মিথ।
বিদ্রোহের খবর অ্যান আর মোতিয়ার কানে আগেই পৌঁছেছিল। সন্ধ্যায় এসে পৌঁছালো অ্যালেকজান্ডারের মৃত্যুসংবাদ আর সেইসাথে যত দ্রুত সম্ভব রেসিডেন্সীর ভিতর আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ। শোকের অভিঘাতে অ্যান সাথে সাথে সংজ্ঞা হারালো। ঘটনার আকস্মিকতায় অসহায় বোধ করলেও মোতিয়া নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। মনে মনে সে ঠিক করে ফেললো তার পরবর্তী কর্তব্য। মোতিয়ার শুশ্রূষায় অ্যানের জ্ঞান ফিরলো। তখন মোতিয়া অ্যানকে বুকে টেনে নিয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দিল, গভীর মমতা ভরে তাঁকে সব কথা ধীরে ধীরে বোঝালো। মোতিয়ার কথা শেষ হলে অ্যান কেবল অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলো তাঁর বাড়ীর পরিচারিকার দিকে।
এদিকে মোতিয়া বাড়ী ফিরছে না দেখে রামচরণ বেরিয়ে পড়লো লক্ষ্ণৌর রাস্তায়। রাস্তায় তখন প্রচুর শোরগোল, আমজনতার মাঝে মাঝে মিশে আছে বিদ্রোহী সেনারা, তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খুঁজে চলেছে ব্রিটিশদের। তাদের কেউই অবশ্য রামচরণের পথ আটকালো না। লক্ষ্ণৌর রাস্তায় রামচরণকে প্রায় সকলেই চেনে, কারণ তার গায়ের আঁতরের সেই মিঠে গন্ধ! চারিদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে দ্রুত পা চালিয়ে সে পৌঁছে গেল ব্রিটিশ দম্পতির বাড়ী।
৫
সেই দিন রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ দম্পতির গৃহ থেকে বেরিয়ে এল দুই ছায়ামূর্তি, অন্ধকারে তাদের ভাল করে দেখা যায় না। তবে তাদের গায়ের মিঠে গন্ধে লক্ষ্ণৌ শহরের যে কেউ বলে দিতে পারবে যে তারা হল রামচরণ আর তার স্ত্রী মোতিয়া। রাস্তায় বিদ্রোহী সেনারা তাদের পথ আটকালো।কিন্তু রাস্তার আমজনতা রামচরণের পরিচয় দিতে তারা সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করেই রামচরণ আর তার স্ত্রীকে রেহাই দিল। কিন্তু বিদ্রোহীদের দলটি জানতে পেরে গেল যে সেই গৃহে তখনও লুকিয়ে রয়েছে এক ব্রিটিশ অফিসারের স্ত্রী। লক্ষ্ণৌ শহরের রাতের অন্ধকারে সেই দুই ছায়ামূর্তি চারিদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে পথ চলতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে তারা তাদের গন্তব্যস্থলে এসে উপস্থিত হল।
রেসিডেন্সীর পাহারাদাররা দুজন দেশী মানুষকে দেখে বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে এল। তখন সেই দেশী মহিলা তাঁর মাথার ঘোমটা সরাতেই বেরিয়ে পড়লো তাঁর মাথার কালো রঙের কোঁকড়ানো চুল। পাহারাদাররা অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখলো যে সেই মহিলা আসলে এক গোরা মেমসাহেব! তারা তখন রামচরণ আর অ্যানকে রেসিডেন্সীর ভিতরে যাওয়ার অনুমতি দিল। অ্যানকে রেসিডেন্সীর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়ে রামচরণ মোতিয়ার কাছে করা তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলো। অ্যানের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে সে বেরিয়ে এল রেসিডেন্সীর বাইরে। তারপর যে পথ ধরে সে এসেছিল, সেই পথেই সে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করলো।
রামচরণ রেসিডেন্সীর পথ ছেড়ে যাওয়ার পর সেই রাতে সেই পথেই এগিয়ে এল বিদ্রোহী সেনার একটি বিশাল দল। তারা চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে ধরলো রেসিডেন্সীর বাড়ীগুলিকে। তাদের মধ্যে যাদের নিশানা অব্যর্থ, তারা জায়গা করে নিল রেসিডেন্সীর আশেপাশের বাড়ীগুলির ছাদে, নিকটবর্তী মসজিদের কক্ষে। চারিদিক দিয়ে রেসিডেন্সীকে অবরোধ করে ভিতরে আশ্রয় নেওয়া ব্রিটিশ নাগরিকদের পালাবার পথ কার্যত তারা বন্ধ করে দিল। এইভাবেই শুরু হল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়া সিপাহী বিদ্রোহের এক অধ্যায় – লক্ষ্ণৌর রেসিডেন্সী অবরোধ।
পরের ছমাস ধরে এই অবরোধ চলে। সেই দীর্ঘসময়ে ব্রিটিশ সেনা ও নাগরিকরা রেসিডেন্সীর আড়াল থেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আত্মরক্ষার লড়াই চালিয়ে যায়। সংঘর্ষে উভয়পক্ষরই প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু রেসিডেন্সীর ভিতর আগে থেকেই প্রাণে বাঁচার প্রয়োজনীয় রসদ মজুত থাকায় বিদ্রোহী সেনারা অবরোধের প্রকৃত ফায়দা তুলতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে রেসিডেন্সীর ভিতর আশ্রয় নেওয়া মানুষদের মনোবল এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। রেসিডেন্সীর ভিতর জমা করা রসদ ক্রমে কমতে থাকে, বাড়তে থাকে যুদ্ধে মৃত মানুষের সংখ্যা। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মনোবল জোগাড় করাই দুরূহ হয়ে পড়ে। রেসিডেন্সীর ভিতরের হাসপাতালে যুদ্ধে আহতদের শুশ্রূষার ব্যবস্থা করা হয়। সেই আহত মানুষদের আর্তনাদের মাঝে সেই হাসপাতালে একদিন শোনা যায় এক নবজাতকের ক্রন্দনধ্বনি। যেন ধ্বংসের মাঝে আবার জেগে ওঠে প্রাণের স্পন্দন!
সেই নবজাতকের জন্মের ঠিক একমাস পরে ব্রিটিশ সেনাপতি কলিন ক্যাম্পবেল তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীর সাহায্যে রেসিডেন্সীকে অবরোধমুক্ত করেন।লক্ষ্ণৌ শহরও পুনরায় ব্রিটিশদের দখলে চলে আসে।
রেসিডেন্সী অবরোধমুক্ত হলে তার ভিতরের আশ্রিতরা দীর্ঘ ছমাস পরে বাইরের দুনিয়ায় পা রাখেন। সেই তারিখটা ছিল ১৯ শে নভেম্বর। ব্রিটিশ সেনার সহযোগিতায় ব্রিটিশ নাগরিকরা দলে দলে রেসিডেন্সীর বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকেন। সেইসময় তাঁদের মধ্যে দেখা মেলে কোঁকড়ানো কালো চুলের এক মেমসাহেবের। তাঁর কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে একটি ছোট্ট ফুটফুটে শিশু, মার মত তারও মাথার চুলের রঙ কালো!
৬
রেসিডেন্সী থেকে বেরিয়ে শিশুকোলে অ্যান সোজা এসে উপস্থিত হয় মোতিয়ার বাড়ীর ঠিকানায়। কিন্তু সেই বাড়ীতে এখন রামচরণ একা থাকে। এই ছমাসে রামচরণ অনেক বুড়িয়ে গেছে, দূর থেকে দেখলে তাকে চিনতে অসুবিধা হয়। তার গায়ে আঁতরের সেই মিঠে গন্ধও আর নেই। তবু অ্যান চিনতে পারে তাঁর জীবনদাতাকে। রামচরণের মুখেই অ্যান জানতে পারে মোতিয়ার করুণ পরিণতির কথা।
সেই দুঃস্বপ্নের রাতে মোতিয়ার পরিকল্পনাতে অ্যান আর মোতিয়া পোশাক অদলবদল করে নেয়। তারপর মোতিয়ার পোশাকে অ্যান রামচরণের সাথে বেরিয়ে আসে ব্রিটিশদের কাছে অভিশপ্ত হয়ে পড়া সেই লোকালয় থেকে। অ্যানের পোশাকে মোতিয়া থেকে যায় ব্রিটিশ দম্পতির গৃহে। অ্যানের নিষ্কৃতির পথ মসৃণ করতেই মোতিয়া সেই রাতে এত বড় ঝুঁকি নেয়। সেই অভিশপ্ত রাতে রামচরণ বিদ্রোহীদের নাকের ডগার নিচ দিয়ে মোতিয়ার ছদ্মবেশধারী অ্যানকে পৌঁছে দেয় সুরক্ষিত আশ্রয়ে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও রামচরণ পূরণ করে মোতিয়াকে দেওয়া তার শেষ প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই রাতে মোতিয়া তার কথা রাখেনি। রামচরণকে সে কথা দিয়েছিল যে রামচরণ ফিরে আসা পর্যন্ত সে অপেক্ষা করবে। কিন্তু সেই রাতে রেসিডেন্সী থেকে ফিরে গিয়ে রামচরণ আর মোতিয়াকে পায়নি, খালি পেয়েছে মোতিয়ার গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ। মোতিয়া তার কথা রাখেনি!
সেই রাতের সেই অভিশপ্ত স্মৃতিকে নিত্যসঙ্গী করেই বৃদ্ধ মালী এখন লাল কিলার বাগানে গোলাপের পরিচর্যা করে। এখন দিল্লীতে ঠাণ্ডার সময়, তাই গোলাপের জোগান পর্যাপ্ত। শাহী হাম্মামের জন্য বাগানের মালীকে আর আঁতর পৌঁছে দিতে হয়না পরিচারিকার কাছে। আঁতর বানানো রামচরণ বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ সেই আঁতরের গন্ধ তাকে এক প্রিয়জনের কথা মনে করায়। সেই কাছের মানুষটিকে হারিয়ে দিল্লীর ঠাণ্ডায় বৃদ্ধ মালীর মনের ভিতরেও শীতল হাওয়া বইতে থাকে!
লক্ষ্ণৌতেও এখন গোমতী নদীর উপর দিয়ে শীতল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়া এসে লাগছে বাড়ীর ছাদে শিশুকোলে বসে থাকা এক মেমসাহেবের কোঁকড়ানো কালো চুলে। অ্যান তাঁর দেশে ফিরে যাচ্ছে। তাঁর ব্যাগের ভিতর সযত্নে রাখা আছে একটি সাদা রঙের গাউন। সেই গাউনে এখনও মেখে আছে আঁতরের মিঠে গন্ধ। বৃদ্ধ রামচরণ এই গাউনটি তুলে দিয়েছে তাঁর হাতে। আর সেইসাথে তুলে দিয়েছে তার সারা জীবনের পরিচিতি, যা এখন রাখা আছে অ্যানের বাড়ীর ছাদের এক কোণায়। অ্যানের বাড়ীর ছাদ এখন ভরে থাকে সেই বসরাই গোলাপের মিষ্টি গন্ধে। সেই গোলাপ গাছটিকে অ্যান সর্বক্ষণ আগলে রাখে, সেই গোলাপের মিষ্টি গন্ধেই সে পাশে পায় এক প্রিয় মানুষকে। সেই গোলাপের গন্ধেই এখন বেঁচে থাকে বসরাই এ বাহার!
*************************
বিরহ বেলায়
১
একজোড়া হরিণীর চোখ খবরের কাগজের পাতায় কি যেন খুঁজে চলেছে। সেই কাগজের পাতা ছেয়ে আছে দেশাত্মবোধক গল্প-কবিতায়। আর তার মাঝে মাঝে লুকিয়ে আছে কিছু স্থানীয় খবর, বিজ্ঞাপন ও গুটিকয়েক বিনোদনমূলক রচনা। এই জরুরি সময়ে দেশবাসীর মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলাই সংবাদপত্রগুলির প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই উৎসুক চোখ দুটি কাগজের পাতায় খুঁজে চলেছে বিশেষ কারও লেখা একটি কবিতা।
এক শীতের সকালে বারান্দার মিঠে রোদে বসে সোফি খবরের কাগজ পড়ছে। তার হাতে ধরা একটি সংবাদপত্র, যা প্রকাশিত হয় প্রতি শনিবার রাতে। পাশের বাড়ীর উইলিয়ামের কাছ থেকে প্রতি রবিবার সোফি সেই সংবাদপত্র চেয়ে নিয়ে আসে। তারপর বারান্দায় বসে সে চোখ ভরে সেই সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক উঠতি লেখকের রচনা পড়ে। সেই লেখকের রচনায় সোফির মন ভিজে যায়। কোথা থেকে যেন এক মন ভাল করা মিষ্টি অনুভূতি এসে তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এক নিঃশ্বাসে সোফি পড়ে ফেলে সেই লেখকের রচনা। তারপর স্থির হয়ে বসে সে তার মনের ভিতর ভাল লাগার সেই অনুভূতিকে বারে বারে স্পর্শ করে। সেইসময় মনের গোপন বাসনায় তার ইচ্ছা হয় সেই লেখককে সারাজীবন তার পাশে পেতে।
প্রতি রবিবার বিকাল বেলায় বাড়ীর পাশের সমুদ্রতীরে সোফি দেখা করে উইলিয়ামের সাথে। সেইসময় সেই বালুকাবেলায় দুই মাঝবয়সী ব্রিটিশ তরুণ-তরুণী একে অপরের সান্নিধ্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। সেই সমুদ্রতটে মাঝে মাঝে মেঘ ঘনিয়ে আসে। আবার কখনও ইংলিশ চ্যানেলের হাওয়ায় সেই মেঘ সরে গিয়ে ঝলমল করে রোদ ওঠে। ভাল লাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন দুটি মন টেরই পায় না যে কি করে সময় কেটে যায়! বিদায়লগ্নে সোফি সেই খবরের কাগজ উইলিয়ামকে ফিরিয়ে দেয়, নিজের কাছে রেখে দেয় শুধু সেই ভাল লাগার অনুভূতি। খবরের কাগজ আবার ফিরে যায় সেই উঠতি লেখকের হাতে! সেই পড়ন্ত বিকালে সূর্যের আলোর লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে সোফির গালে।
তবে খবরের কাগজে চোখ রেখে সোফি শুধু উইলিয়ামের লেখাই পড়ে না, প্রতিটি পাতার বিজ্ঞাপনে সে নিজের জন্য একটা চাকরীরও খোঁজ করে। একটা চাকরী তার খুব প্রয়োজন। সাসেক্স অঞ্চলের এক পুরানো ভাঙা বাড়ীতে সোফি তার পিতা জর্জকে নিয়ে থাকে। জর্জ প্রায় ছমাস হল জীবিকাহীন। সে এই অঞ্চলেরই এক কাপড়ের মিলে চাকরী করতো। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মূলতঃ অস্ত্র তৈরীর কারখানায় চাহিদা বাড়ে। কাপড়ের মিলের বহু শ্রমিক সামান্য বেশী রোজগারের আশায় অস্ত্র তৈরীর কারখানায় যোগ দেয় অথবা সৈন্যদলে নাম নথিভুক্ত করে। ফলে সাসেক্স অঞ্চলের কাপড়ের মিলটিতে উৎপাদন কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে মালিকপক্ষ মুনাফা বজায় রাখতে বহু উদ্বাস্তু বেলজিয়ান ও আইরিস নাগরিকদের কাজে নেয়। এইসব উদ্বাস্তু শ্রমিকদের কম বেতনে অনেক বেশীক্ষণ খাটানো যায়। মালিকপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইংরাজ শ্রমিকদের ইউনিয়ন আন্দোলন শুরু করে। মিলের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। তারপর প্রায় ছমাস আগে বন্ধ হয়ে যায় সেই কাপড়ের মিল। সেইসময় থেকে জর্জ বেকার। ব্রিটিশ সেনাদলে নাম লেখানোর মত বয়স বা শারীরিক সামর্থ্য কোনোটাই তার নেই। তাই সেই অসহায় বৃদ্ধ এখন সংসার চালানোর জন্য একমাত্র সন্তানের উপরই নির্ভর করে থাকে।
তার মেয়ে অপরূপ সুন্দরী, কিন্তু দারিদ্রের কালিমায় সেই রূপ যেন চাপা পড়ে যায়। সেলাইয়ের কাজ করে সোফির নরম হাত দুটি রুক্ষ্ম কঠিন হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ পিতা সেইসব কিছুই খেয়াল করে, কিন্তু একমাত্র কন্যার ভার সে কোনোভাবেই লাঘব করতে পারেনা।
সোফি কিন্তু খবরের কাগজের পাতায় চোখ রেখে একমনে চাকরী খোঁজে। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ব্রিটেনের সামাজিক চিত্র বদলে গেছে। ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সে দেশে দরকার হয়ে পড়েছে প্রচুর লোকবল। দেশের সমর্থ পুরুষরা সবাই নাম লিখিয়েছে সেনাদলে। ফলে এতদিন ধরে পুরুষদের করে আসা কাজগুলির দায়িত্ব এসে পড়েছে দেশের মহিলাদের উপর। সংসার সামলানোর পাশাপাশি কৃষিকাজ, দেশের ভিতর পণ্যপরিবহন প্রভৃতি নানা কাজে ব্রিটিশ মহিলারা যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও নানা অসামরিক কাজে জুড়ে গেছে মহিলাদের নাম। কারখানায় যুদ্ধাস্ত্র তৈরীর মত বিপদজনক কাজ থেকে শুরু করে, যুদ্ধক্ষেত্রে সেই অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া, যুদ্ধে আহতদের শুশ্রূষা করা, তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসার জায়গায় পৌঁছে দেওয়া প্রভৃতি নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্রিটিশ মহিলারা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। তাই ব্রিটিশ সমাজে মহিলাদের চাকরীর সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী।
সোফি তাই নিয়মিত কাগজের বিজ্ঞাপনে চোখ রাখে । একদিন সেইরকমই এক বিজ্ঞাপনে তার চোখ আটকে গেল। ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রে অসামরিক কাজের জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এক মহিলাকর্মী প্রয়োজন। সেই বিজ্ঞাপনে সোফি আশার আলো দেখতে পেল। বৃদ্ধ পিতা ও কাছের মানুষ উইলিয়ামকে এক সচ্ছল জীবন উপহার দেওয়ার চিন্তায় সোফির চোখ ছলছল করে উঠলো!
২
উইলিয়াম সাসেক্স অঞ্চলের এক তরুণ লেখক। এক স্থানীয় সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। উইলিয়াম কবিতা লেখে, কল্পনাশক্তির সাথে নিজের মনের মাধুর্য মিশিয়ে সে ফুটিয়ে তোলে ছবির মত সুন্দর এক একটি কবিতা। সেই কবিতা পড়ার সময় পাঠক-পাঠিকার চোখের সামনেও ভেসে ওঠে সেইসব ছবি। কবির মুন্সিয়ানায়, তার প্রাঞ্জল ছন্দে সেইসব টুকরো টুকরো ছবি তখন পাঠক-পাঠিকার মনে দীর্ঘদিনের জন্য জায়গা করে নেয়। এক দরিদ্র কবিও খুঁজে পায় তার কবিতা লেখার সার্থকতা!
তবে বিশ্বযুদ্ধের এই ঘনঘটায় পৃথিবী গদ্যময়। যুদ্ধের রূঢ় বাস্তবতার মাঝে জীবনে ছন্দ খুঁজে পাওয়াই দায়। উইলিয়ামের কবিতার কদরও তাই সীমিত। তার পরিচিতি শুধুমাত্র সাসেক্স অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। তবে সে স্বপ্ন দেখে যে একদিন তার কবিতার খ্যাতি দূরত্বের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে নানা দেশে। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই সেই দরিদ্র কবি কবিতা লেখে।
কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে সে বড় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্যের রূঢ় বাস্তবতা তাকে কবির কল্পনার জগৎ থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনে। সেইসময় কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে তার শিল্পীসত্তা ভারী অসহায় বোধ করে। নিজের আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তখন উইলিয়ামের দুঃশ্চিন্তা হয়। সোফির কথা ভেবে সেই দুঃশ্চিন্তা আরও বাড়ে। তার মন চায় সেই প্রিয় মানুষটির পাশে দাঁড়াতে, সেই দরিদ্র তরুণী ও তার বৃদ্ধ পিতার সংসারের হাল ধরতে। তখন উইলিয়াম সেই সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ঘাঁটে, একটা স্থায়ী চাকরীর পথ খোঁজে। প্রয়োজনে মৃত পিতা মাতার স্মৃতি বিজড়িত সেই পুরানো বাড়ী ছেড়ে, দেশের বাইরে যুদ্ধক্ষেত্রে নাম লেখানোর কথাও সে চিন্তা করে।
৩
সময়টা ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাস, ইউরোপে শুরু হয়ে গেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। একদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও তাদের সহযোগী দেশগুলিকে নিয়ে গড়ে ওঠা মিত্রশক্তি। অন্যদিকে জার্মানি, হাঙ্গেরি, তুর্কি প্রভৃতি দেশ নিয়ে গড়ে ওঠা যুযুধান বিপক্ষ। ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষই মনে করেছিল যে এই যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী হবে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনা অফিসার হাবার্ট কিচেনার এই ধারণার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলবে। আর সেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দরকার হবে প্রচুর লোকবল। ফলে দেশের সাধারণ মানুষকেও সৈন্যদলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন এসে পড়বে। তাই কিচেনারের উপদেশে যুদ্ধের প্রথম বছর থেকেই ব্রিটেনের নানা সংবাদপত্রে সাধারণ মানুষকে সেনাদলে নেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি জারী করা হয়। সেইসব বিজ্ঞাপন দেখে দেশপ্রেমের জোয়ারে সৈন্যদলে নাম লেখানোর জন্য ব্রিটেনের রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। ব্রিটেনের নানা প্রান্তে সেনা নিয়োগের অফিসগুলিতে ভিড় উপচে পড়ে। সাধারণ মানুষদের নিয়ে গড়ে তোলা এই সেনাদলগুলি ব্রিটেনে পরিচিত হয় কিচেনারস্ আর্মি নামে।
তবে সাধারণ মানুষদের থেকে ব্যাপক সাড়া মেলাতে অন্য সমস্যা দেখা দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে বয়ঃসীমার কোনো উল্লেখ না থাকায়, বহু অপরিণত তরুণও সেইসময় সেনাদলে নাম লিখিয়ে ফেলে। ব্যাপকহারে সেনা নিয়োগের ফলে নতুন সেনার জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধের সাজপোশাকের অভাব দেখা দেয়। এমনকি প্রশিক্ষণের সময় এই সেনাদের নিজেদের জামা-জুতা ব্যবহার করতেও বলা হয়। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য দক্ষ প্রশিক্ষকেরও অভাব ঘটে। পুরানো পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র দিয়েই এই নতুন সেনাদলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেইসময় যুদ্ধে এত ব্যাপকহারে প্রাণহানি ঘটে যে শুধুমাত্র প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়েই এই নতুন সেনাদলগুলিকে প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত দক্ষতার অভাবে এই নবনিযুক্ত সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে সহজেই প্রাণ হারায়।
এইসকল কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকের বছরগুলিতে সাধারণ মানুষের সেনাদলে যোগদানের উৎসাহে ভাটা পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহতার প্রকৃত চিত্র জনমানসে ফুটে ওঠে। তবু সেই ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করে কিছু সাধারণ মানুষ তখনও সেনাদলে নাম লেখাতে থাকে। দেশপ্রেম ছাড়াও একটা স্থায়ী রোজগারের আশায় উইলিয়ামের মত বহু ব্রিটিশ তরুণ নিজেদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের বিপদকেই বেছে নেয়।
৪
দক্ষিণ পূর্ব ইংল্যান্ডে ছবির মত সুন্দর কাউন্টি সাসেক্স। তার দক্ষিণে বিখ্যাত ইংলিশ চ্যানেল যা আদতে আটলান্টিক মহাসাগরেরই অংশ। বহুযুগ ধরে ইংলিশ চ্যানেল ইংল্যান্ডকে ইউরোপের অন্যান্য দেশের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে এসেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই চ্যানেলের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদূর সুইজারল্যান্ড থেকে ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে মিত্রশক্তির যুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত ট্রেঞ্চ বা পরিখা। জলপথে জার্মানির আক্রমণ প্রতিহত করতে ঢেলে সাজানো হয়েছে ইংলিশ চ্যানেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে। ইংলিশ চ্যানেলের সাথে সাথে গুরুত্ব বেড়েছে সাসেক্সেরও। সেখানকার সেনা অফিসে প্রতিনিয়ত চলছে নতুন সেনা নিয়োগের কাজ। ইংলিশ চ্যানেলের অপর পাড়ে ফ্রান্স, সেখানে চলছে তুমুল যুদ্ধ। সাসেক্সের বাতাসে ভাল করে কান পাতলে এখন স্পষ্ট শোনা যায় সেই যুদ্ধের গোলাবারুদের শব্দ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচ এসে লেগেছে সাসেক্সের মানুষের জীবনেও। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জুন উত্তর ফ্রান্সের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাঁচ ঘণ্টা সময়ের ব্যবধানে রয়্যাল সাসেক্স রেজিমেন্টের সতেরো জন অফিসার ও সাড়ে তিনশো জন সেনা নিহত হয়েছে। জার্মান সেনার হাতে বন্দি হয়েছে সেই রেজিমেন্টের হাজারেরও বেশী সদস্য। গোটা সাসেক্সের বুকে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সেদিন সাসেক্সের বহু পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র সন্তানকে, তাদের বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারীকে। সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে সাসেক্স এখনও লড়ে চলেছে। সেখানকার মানুষ মনে দৃঢ়তর সংকল্প নিয়ে সেনাদলে যোগ দিয়েছে। আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে সাসেক্সের রয়্যাল রেজিমেন্ট।
এখন ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাস, সাসেক্সের সেনা অফিসে রয়্যাল রেজিমেন্টের জন্য নতুন সেনা নিয়োগের কাজ চলছে। সেই অফিসে রেজিমেন্টের কয়েকটি অসামরিক পদের জন্যও প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। সাসেক্সের সাধারণ মানুষকে এই পদগুলি সম্বন্ধে অবগত করার জন্য একটি স্থানীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে।
সোফির বাড়ীর পাশে ইংলিশ চ্যানেলের সমুদ্রতটে কিন্তু এখনও যুদ্ধের আঁচ এসে লাগেনি। সেই জায়গাটা এমনিতেই নিরিবিলি। এখনও সেই নির্জন সমুদ্রতটে মাঝে মাঝে মেঘ ঘনিয়ে আসে। তারপর একসময় ইংলিশ চ্যানেলের দিক থেকে বয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ায় সেই মেঘ সরে গিয়ে ঝলমল করে রোদ ওঠে। তখন সেই বালুকাবেলায় একে অপরের হাত ধরে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া দুই তরুণ-তরুণী স্পষ্ট দেখতে পায় ইংলিশ চ্যানেলের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া এক ঝাঁক সাদা পায়রাকে!
৫
পশ্চিম সাসেক্সে রয়্যাল রেজিমেন্টের অফিস, সেখানে সকালের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা। সেই অফিসের রিসেপশন রুমের বামদিকের হলঘরে বসানো হয়েছে অসামরিক পদের জন্য দরখাস্ত করা প্রার্থীদের। সেই হলঘর থেকে একজন একজন করে প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডেকে নেওয়া হচ্ছে ভিতরের একটি ছোট ঘরে। নির্বাচিত হলে রেজিমেন্টের তরফ থেকে নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হবে প্রার্থীর বাড়ীর ঠিকানায়। নিয়োগপত্র পাওয়ার দিন তিনেকের মধ্যে প্রার্থীকে এসে যোগ দিতে হবে রেজিমেন্টের অফিসে। সেখান থেকে প্রার্থীদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে তাদের আসল কর্মক্ষেত্রে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্রান্সের কোনো না কোনো যুদ্ধক্ষেত্র।
সেই হলঘরের এককোণে চেয়ারের উপর বসে আছে এক মাঝবয়সী সুন্দরী ব্রিটিশ তরুণী। তার মাথার ঘন লম্বা চুল গোছ করে মাথার উপর বাঁধা। তার সাজপোশাক যথেষ্ট মলিন, দেখলে বোঝা যায় যে সে এক গরীব ঘরের মেয়ে। তবু সেই তরুণীর রূপ ছাইয়ে চাপা পড়ে থাকা আগুনের মত যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সোফির মুখ আজ ম্লান হয়ে আছে। তার মনের ভিতর চলছে এক গভীর অন্তরদ্বন্দ্ব। একটা স্থায়ী রোজগারের আশায় সে এই পদের জন্য দরখাস্ত করেছিল। তখন তার মনে হয়েছিল যে সে চাকরীটা পেলে বৃদ্ধ পিতা আর উইলিয়ামের দারিদ্র্য হয়তো চিরতরে ঘুচে যাবে। কিন্তু এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে এই চাকরীতে যোগ দিলে, তাকে সেই দুই আপনজনকেই ছেড়ে দূরে চলে যেতে হবে। কর্তব্য আর ভালবাসার টানাপোড়েনে সোফি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা যে সে কি করবে! অবশেষে সেই ভিতরের ঘরে যাওয়ার জন্য সোফির ডাক পড়লো।
সেই একইসময়ে সেনা অফিসের ভিতরের দিকের এক খোলা মাঠে লাইনে দাঁড়িয়ে এক মাঝ বয়সী ব্রিটিশ তরুণ। তার চোখে মুখে শিল্পীসত্তার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সেই শিল্পীসত্তাকে পিছনে ফেলে সেনাদলে নাম লেখাতে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার শক্ত চোয়ালে ফুটে উঠছে তার মনের সংকল্প। উইলিয়াম মনে মনে স্থির করে ফেলেছে যে সে আর লিখবে না! তার নিজের আর সোফির ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে সে যে করে হোক একটা স্থায়ী চাকরী জোগাড় করবেই। প্রয়োজন হলে সে রয়্যাল রেজিমেন্টের হয়ে ফ্রান্স বা অন্য কোনো দূরদেশেও যুদ্ধ করতে যাবে। কিন্তু যে করে হোক এবার সে তার চারপাশের দারিদ্র্যের অন্ধকার দূর করবেই।
“এ কি, তুমি এখানে?” সেনা অফিসের গেটের বাইরে উইলিয়ামকে দেখে সোফির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো! তার আর বুঝতে বাকী রইলো না যে উইলিয়াম সেখানে এসেছে সেনাদলে নাম লেখাতে। এতদিন সে উইলিয়ামের ভিতর এক কবিকে দেখেছে। উইলিয়ামের ভিতরের সেই শিল্পীসত্তাকে সে প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছে। সেই কবি যাতে প্রতিষ্ঠা পায়, তার জন্য প্রতিনিয়ত সে চার্চে প্রার্থনা করেছে। উইলিয়ামের শিল্পীসত্তা যাতে বিকাশের পূর্ণ অবকাশ পায় সেইজন্য সে নিজে বেছে নিয়েছে সেনাদলের অসামরিক পদ।
কিন্তু সেই উইলিয়াম নিজেই সেনাদলে যোগ দিতে চলেছে জানতে পেরে সোফির মনের চিন্তাভাবনাগুলো কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। যুদ্ধে উইলিয়ামের সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে সোফির ভারী ভয় করতে লাগলো, নিজেকে তার ভারী একা, অসহায় মনে হল। তার মনের ভিতরের সেই তীব্র উৎকণ্ঠা ক্রমে ক্রোধ হয়ে ঝরে পড়লো তার প্রিয় মানুষটির উপর। উত্তেজিত কণ্ঠে উইলিয়ামকে সে বলে উঠলো – “তবে কি কবি শেষে কলম ছেড়ে কামান ধরবেন?” সেই শ্লেষ মেশানো প্রশ্নের উত্তরে উইলিয়াম শান্ত গলায় জবাব দিল – “কলম চালিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা না পেলে কবিকে কামান চালিয়েই রোজগারের কথা চিন্তা করতে হয়!” উইলিয়ামের জবাবে সোফি মনে ভারী আঘাত পেল। আর কথা না বাড়িয়ে সে সেখান থেকে সোজা তার বাড়ীর পথে রওনা দিল। উইলিয়াম কিছুক্ষণ সেই পথের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো, তারপর সেও ধীরেধীরে সেই একই পথে তার বাড়ীর দিকে রওনা হল। তারা দুজনেই একে অপরকে সাহায্য করতে চেয়েছিল, জীবনে একে অপরের পাশে থেকে চলতে চেয়েছিল। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝিতে আজ সেই চলার পথেই তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরী হয়ে গেল। মনে একরাশ অভিমান নিয়ে বাড়ী পৌঁছে সোফি তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। উইলিয়াম আর বাড়ী না ঢুকে সোজা উপস্থিত হল সমুদ্রের তীরে।
ইংলিশ চ্যানেলের তীরে আজ কালো মেঘ করে আছে, পরিবেশ ভারী গুমোট। কিছুক্ষণ পরেই সেই বালুকাবেলায় অঝোরে বৃষ্টি নামলো!
৬
নভেম্বর মাসের এক রবিবারের বিকাল, সাসেক্সের দক্ষিণে ইংলিশ চ্যানেলের নির্জন সমুদ্রসৈকত। রবিবারে সাধারণতঃ এই সমুদ্রসৈকতে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। সমুদ্রতটের নিকটবর্তী এলাকাগুলি থেকে অনেক পরিবারই ছুটি কাটাতে নেমে পড়ে সমুদ্রে। তাদের হৈ-হুল্লোড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে সমুদ্রতটের চারপাশ। বিকাল হলে তারা ধীরেধীরে বাড়ী ফিরে যায়। তখন সেই শান্ত মনোরম পরিবেশে বালির উপর দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে বেড়ায় দুই তরুণ-তরুণী।
কিন্তু আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। থেকে থেকে সমুদ্রতটের বালি ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে। সমুদ্রতট তাই আজ সকাল থেকেই নির্জন। গত কয়েকদিন ধরেই ইংলিশ চ্যানেলের উপর কালো মেঘ জমে আছে। সেইসাথে মেঘ জমেছে দুই তরুণ-তরুণীর মনেও। তাই আজ বিকালে সেই বালুকাবেলায় তাদের আর দেখা মিললো না। ইতিমধ্যে উইলিয়াম আর সোফি দুজনের কাছেই পৌঁছে গেছে সাসেক্সের রয়্যাল রেজিমেন্টের নিয়োগপত্র। আর দু একদিনের মধ্যেই তাদের যোগ দিতে হবে সেনা অফিসে। তারপর হয়তো একে অপরকে ছেড়ে তাদের চলে যেতে হবে কোনো অজানা জায়গায়। সেখানে তাদের দুজনের জন্যেই অপেক্ষা করে থাকবে নানা রকমের প্রতিকূলতা। হয়তো তাদের দুজনের আর কোনোদিন দেখাই হবে না।
একে অপরকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে উইলিয়াম আর সোফি পরেরদিন দেখা করলো সেই সমুদ্রতটে। সোমবার অপরাহ্নের সমুদ্রতীর জনমানবহীন। খালি সব হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়ে সেই নির্জন বালুকাবেলায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই তরুণ-তরুণী। বিদায়ের আগে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাতে তারা দুজনেই নিয়ে এসেছে উপহার। সোফি তার প্রিয় কবির জন্য নিয়ে এসেছে একটি লেখার ডায়েরী আর একটি কলম। উইলিয়াম তার প্রিয়তমার লম্বা চুলের খোঁপায় লাগানোর জন্য নিয়ে এসেছে তার বাড়ীর বাগানের একটি লাল গোলাপ।
উইলিয়ামই প্রথম মুখ খুললো। করুণ হাসি হেসে সে বললো – “এবার থেকে রবিবারের বিকালগুলো খুব একলা হয়ে যাবে!” সোফি তার নরম হাসিতে জবাব দিল – “এবার থেকে রবিবারের বিকালে না হয় মন ভাল করা কয়েকটা কবিতা লিখ!” সোফির কথা শুনে উইলিয়াম মাথা নিচু করে জবাব দিল – “না, ঠিক করেছি এই জীবনে আর কবিতা লিখবো না!” উইলিয়ামের জবাব শুনে সোফি চুপ করে রইলো। তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উইলিয়াম বলে উঠলো – “কদিন ধরে এদিকটা বেশ গুমোট হয়ে আছে, ঠাণ্ডাটাও অনেক কমে গেছে। তুমি দেখছি মাথায় স্কার্ফ পড়ে আছ, তোমার ঠাণ্ডা লেগেছে বুঝি?” প্রশ্ন শুনে সোফি তার মাথার স্কার্ফ খুলে ফেললো। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে উইলিয়াম দেখলো যে সেনাদলে যোগদানের আগে সোফি কেটে ফেলেছে তার মাথার লম্বা ঘন চুল।
উইলিয়াম আর সোফির আর উপহার বিনিময় করা হল না। বহুদিনের সাহচর্যে তাদের মধ্যে ধীরেধীরে যে মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা আজ তার শেষ পরিণতির দিকে এগিয়ে চললো। বিরহের সেই বালুকাবেলায় দুই ব্রিটিশ তরুণ-তরুণী একে অপরকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে আপন আপন অদৃষ্টের পথে রওনা দিল। পিছনে পড়ে রইলো খালি সেই নির্জন সমুদ্রসৈকত আর তার উপর ঘনিয়ে আসা ঘন কালো মেঘ!
************************
তুমি রবে নীরবে
১
মুঘল অশ্বারোহী দলের সেনাপতি জান মহম্মদ। তার উপর দায়িত্ব পড়েছে পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার দিল্লীর সৈন্যদের খুঁজে বের করে তাদের একে একে খতম করার। সেই আদেশ পালন করতেই সে আর তার মুঘল সৈন্যদল তল্লাশি চালাচ্ছে দিল্লীর আশেপাশের গ্রামগুলিতে। তবে জান মহম্মদের মন লালসায় পরিপূর্ণ। তল্লাশি চালানোর অছিলায় গ্রাম লুঠ করাই তার আসল লক্ষ্য। যমুনারতীরে এক গ্রামে প্রবেশের পথে এক ফকিরের মৃতদেহ দেখতে পেয়ে মুঘল সেনাপতির মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। সন্ধ্যার ঠিক আগে সেই গ্রামে প্রবেশ করে জান মহম্মদ ও তার অশ্বারোহী দল গ্রামবাসীকে হুমকি দিয়ে আসে। কোনো ফেরার সৈন্য সেই গ্রামে লুকিয়ে থাকলে পরেরদিন দুপুরের মধ্যে তাকে মুঘল সেনার হাতে তুলে দেওয়ার ফরমানও জারি করা হয়। চতুর লোভী মুঘল সেনাপতি কিন্তু মনস্থির করে ফেলে যে গ্রামে কোনো ফেরার সেনা থাকুক বা নাই থাকুক পরেরদিন সে গ্রাম লুঠ করবেই!
কিন্তু পরেরদিন ভোররাতে গ্রামের বাইরের রাস্তায় ঘোড়া নিয়ে টহল দেওয়ার সময় সে দেখতে পেল যে এক বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ গোপনে গ্রাম ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করছে। জান মহম্মদ যেন চাঁদ হাতে পেল! সেই দুর্বৃত্ত ভোরের আবছা আলোয় অতর্কিতে আক্রমণ করলো সেই নিরস্ত্র মানুষটিকে। নিজের শাণিত তরবারী সেই নিরীহ মানুষটির বুকে গেঁথে দিয়ে জান মহম্মদ তাকে হত্যা করলো। ভোরের আলো ভাল করে ফুটলে সে দেখতে পেল যে সেই বলিষ্ঠ চেহারার লোকটি আসলে এক পীর-ফকির।
মনের ভিতর গ্রাম লুঠ করার গূঢ় অভিসন্ধি নিয়ে সেই ফকিরের মৃতদেহ সাথে করে জান মহম্মদ হাজির হল সেই গ্রামে। কিন্তু গ্রামের মানুষ সেই নিরীহ ফকিরের করুণ পরিণতি দেখে মুঘল সেনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসলো। এতে জান মহম্মদের সুবিধাই হল। আত্মরক্ষার অছিলায় মুঘলসেনা সেই গ্রাম লুঠ করলো, সেখানকার সকল জীবিত প্রাণীকে হত্যা করলো, যে সকল জিনিস লুঠ করা যায় না তাতে তারা আগুন ধরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে এক শান্ত সুন্দর প্রাণোচ্ছল গ্রামকে তারা পরিণত করলো এক প্রাণহীন শ্মশানক্ষেত্রে।
গ্রাম লুঠ করার সময় একটি ছোট্ট বাড়ীর আঙিনায় জান মহম্মদ দেখতে পেল সাদা ধবধবে এক রাজহংসীকে। সেই রাজহংসী তাকে দেখে ভয়ে দৌড় লাগালো বাড়ীর পিছনের যমুনাতীরের দিকে। নৃশংস মুঘল সেনাপতি সেই রাজহংসীর পিছু নিল। তারপর যমুনার তীরে এক শ্বেতচন্দন গাছের তলায় সেই রাজহংসীকে বাগে পেয়ে জান মহম্মদ অব্যর্থ নিশানায় হত্যা করলো সেই নিরীহ প্রাণীটিকে। তার তরবারীর আঘাতে সেই রাজহংসীর রক্ত ছিটকে গিয়ে লাগলো সেই শ্বেতচন্দনের গায়ে।
তখন সেই দুর্বৃত্ত মৃত রাজহংসীর গা থেকে একটি লম্বা সাদা পালক কেটে নিল। সেইসময় সেই শ্বেতচন্দনের মিষ্টি গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করলো। জান মহম্মদ তখন তার তরবারীর আঘাতে সেই শ্বেতচন্দনের বুক থেকে কেটে নিল এক ফালি কাঠ। যমুনার তীরে তার ধ্বংসলীলা সাঙ্গ করে জান মহম্মদ ফিরে এল সেই বাড়ীর আঙিনায়। সেখানে তার নজর পড়লো বাগানের লাল রঙের এক বসরাই গোলাপে। বাদশাহ বাবরের গোলাপ প্রীতি সর্বজনবিদিত। তাই জান মহম্মদ বাগানের সেই গোলাপ গাছটিকেও সাথে নিয়ে নিল বাদশাহের নজরানা হিসাবে।
দিল্লীতে বাদশাহ বাবরের দরবার, সেখানে জান মহম্মদ হাজির হয়েছে নজরানা নিয়ে। মুঘল বাদশাহের সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্য। তিনি নিজেও একজন বিশিষ্ট লেখক। তাই জান মহম্মদ দিল্লীর নতুন বাদশাহের জন্য নিয়ে এসেছে সেই রাজহংসীর একটি লম্বা সাদা পালক। তার আশা বাদশাহ সেটিকে লেখার কাজে কলম হিসাবে ব্যবহার করবেন। আর আছে সেই একফালি চন্দনকাঠ। মুঘল বাদশাহ শৌখিন মানুষ। তাই সেই চন্দনকাঠের সুবাস নিশ্চয়ই তাঁর মনে ধরবে। সবশেষে আছে সেই লাল রঙের বসরাই গোলাপ যা তার চারপাশের পরিবেশকে নিজের বর্ণ-গন্ধে মাতিয়ে রাখে। গোলাপের প্রেমে পাগল মুঘল বাদশাহের যে সেই গোলাপ পছন্দ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই নজরানা দিয়ে বাদশাহকে খুশী করতে পারার ব্যাপারে জান মহম্মদ নিশ্চিত, সেইসাথে নিজের পদোন্নতির আশায় সে ভিতরে ভিতরে ভীষণ উত্তেজিত। মনের ভিতরের সেই উত্তেজনা কোনোক্রমে চেপে রেখে সে তার নজরানা মুঘল বাদশাহের সামনে পেশ করলো।
জান মহম্মদ শুধু একটাই ভুল করে বসলো! তার জানা ছিল না যে বাদশাহ একজন পক্ষীপ্রেমী। সাহিত্য ও গোলাপের পাশাপাশি নানা জাতের পাখীও তাঁর ভীষণ প্রিয়। অকারণে পক্ষী হত্যার তিনি তীব্র বিরোধী। তাই জান মহম্মদের নজরানায় রাজহংসীর সেই লম্বা সাদা পালক দেখে বাবর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হলেন। জান মহম্মদকে তিনি সেই মুহূর্তে মুঘল সেনাপদ থেকে বহিষ্কৃত করলেন। রাজহংসীর পালক ফিরিয়ে দিয়ে তিনি জান মহম্মদকে তখনই দরবার থেকে বিতাড়িত করলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য সে যাত্রায় জান মহম্মদের প্রাণ কোনোক্রমে রক্ষা পেল। জান মহম্মদ প্রস্থান করলে মুঘল বাদশাহের নির্দেশে সেই লাল রঙের বসরাই গোলাপ গাছটি জায়গা করে নিল দিল্লীর কিলার ভিতর মুঘলদের নিজস্ব বাগানে। আর সেই একফালি চন্দনকাঠ জমা পড়লো মুঘল দরবারের এক নামকরা শিল্পীর হাতে। সাথে বাদশাহের ফরমাইশ – সেই একফালি কাঠ দিয়ে তাঁর জন্য বানিয়ে দিতে হবে একটি কারুকার্যময় লেখার ডায়েরী!
২
মুঘল দরবার থেকে বিতাড়িত হয়ে জান মহম্মদ চলে গেল দাক্ষিণাত্যে, যাতে সে মুঘল বাদশাহের রোষানল থেকে দূরে থাকতে পারে। রাজহংসীর সেই লম্বা সাদা পালকটি কিন্তু সে হাতছাড়া করলো না। যে জিনিসটির জন্য তার এত বড় সর্বনাশ হল, সেই জিনিসটিকেই সে কোনো অমোঘ টানে নিজের বুকের কাছে আগলে রাখলো। কিন্তু দিল্লীর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়ে তার সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়লো পশুপাখীদের উপর। সেই ক্রোধেই দাক্ষিণাত্যে পৌঁছে সে বেছে নিল এক কসাইয়ের জীবিকা। সারাদিন ধরে নির্বিচারে প্রাণীহত্যা করে জান মহম্মদ দিল্লীর দরবারে হওয়া তার অপমানের প্রতিশোধ তুলতে লাগলো। সেই অগুনতি নিরীহ প্রাণীর রক্ত ঝরিয়েই সে ফিরে পেতে চাইলো তার মনের হারিয়ে যাওয়া শান্তি!
কিন্তু কসাইয়ের কাজ করে জান মহম্মদের মনের শান্তি ফিরে এল না। বরং সারাদিনের শেষে বাড়ী ফিরে যখন সে এক অমোঘ টানে সেই রাজহংসীর পালক হাতে নিয়ে বসে, তখন তার মন খানিকটা হালকা হয়। তখন জান মহম্মদ রাজহংসীর সেই লম্বা সাদা পালকে গভীর মমতাভরে হাত বুলিয়ে দেয়। সেই পালকের গোড়ার দিকে লেগে থাকা লাল দাগে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের সেই ভয়াবহ নৃশংসতার স্মৃতি। তখন অনুশোচনায় জান মহম্মদের সিনার ভিতরটা জ্বলতে থাকে, বীর মুঘল সেনাপতির দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পরে জল। সেই জলে অনুশোচনার আগুন প্রশমিত হলে সে কিছুক্ষণের জন্য তার মনের শান্তি ফিরে পায়। এইভাবে মনের ভিতর এক গভীর অন্তরদ্বন্দ্ব নিয়ে জান মহম্মদ দিন কাটাতে থাকে দাক্ষিণাত্যের মাদ্রাসপত্তনম নামের এক গ্রামে।
শোনা যায় শেষ জীবনে জান মহম্মদ কসাইয়ের কাজ ছেড়ে দিয়ে উর্দুভাষা চর্চায় মন দেয়। সেইসময় উর্দু লেখার কাজে সে নাকি সেই রাজহংসীর লম্বা সাদা পালককেই তার কলম হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে।
জান মহম্মদ মারা গেলে সেই কলম তার স্মৃতিচিহ্ন হয়ে তার পরিবারের মধ্যেই থেকে যায়। পরবর্তীকালে সেই কলম এসে পড়ে জান মহম্মদের প্রপৌত্র ইসমাইল মহম্মদের হাতে। সেই কলম হাতে ইসমাইল হয়ে ওঠে মাদ্রাসের এক গুমনামা শায়র! পরে সেই হতভাগ্য শায়রের সাথে প্রতারণা করে সেই কলমটি ছিনিয়ে নেয় ফিরিঙ্গি দুর্বৃত্ত ম্যাক্সওয়েল টার্নার।
কিন্তু সেই আশ্চর্য কলমের সাহচর্যে সেই দুর্বৃত্ত ফিরিঙ্গি মনেও আসে পরিবর্তন। মনের ভিতর অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে হতে ম্যাক্সওয়েল সাহেব ফিরে যান তাঁর দেশে, সাথে নিয়ে যান সেই কলম। ইংল্যান্ডে ফিরে শেষ জীবনে সাহেবকে ধর্মভীরুতায় পেয়ে বসে। সারাজীবনের পাপের বোঝা কাঁধে করে ম্যাক্সওয়েল সাহেব হাজির হন এক স্থানীয় চার্চের কনফেশান বক্সে। এক তরুণ খ্রিষ্টান ধর্মযাজকের কাছে তাঁর সারাজীবনে করা পাপের স্বীকারোক্তি করে ম্যাক্সওয়েল সাহেব ভারমুক্ত হন। সেইসময় সেই ধর্মভীরু বৃদ্ধ তাঁর সাথের সেই আশ্চর্য কলমটি তুলে দেন সেই তরুণ ধর্মযাজকের হাতে।
সেই তরুণ ধর্মযাজক কলমটিকে স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতীক মেনে নিয়ে সেটিকে স্থান দেন তাঁর পরিবারের উপাসনা কক্ষে। সেই তরুণ ধর্মযাজকের পৌত্র পরবর্তীকালে পবিত্র খ্রিষ্টানধর্ম প্রচারে ভারতবর্ষে আসেন। ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত ঘুরে তিনি এসে উপস্থিত হন এই বাঙলার নীলকান্তপুর গ্রামে, সেই পৌত্রের নাম পাদ্রী জোসেফ জেফারসন!
৩
শিল্পী ইবাদাত খাঁ, মুঘল বাদশাহ বাবরের দরবারে তার বেশ নামডাক। বাদশাহ শিল্প অনুরাগী, তাই মাঝে মাঝেই বাদশাহের ফরমাইশ মেনে ইবাদাতকে বানিয়ে দিতে হয় শিল্পকলা সমৃদ্ধ নানা জিনিস। রুচিসম্পন্ন মুঘল বাদশাহের সেই জিনিস মনে ধরলে ইবাদাতের কপালে জুটে যায় মোটা ইনাম। সেই জিনিস তখন স্থান করে নেয় মুঘল বাদশাহের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। ইবাদাতের কাছে নতুন ফরমাইশ এসেছে, একফালি চন্দনকাঠ ব্যবহার করে তাকে বানিয়ে দিতে হবে বাদশাহের লেখার ডায়েরী। সেই ডায়েরী এমন হতে হবে যাতে যে কেউ তাতে খুঁজে পায় সেই চন্দনগাছের অস্তিত্ব।
ইবাদাত তার শিল্পীমনের কল্পনায় তৈরী করে সেই ডায়েরীর বাঁধানো মলাট। তার হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় সেই মলাট সে ভরিয়ে দেয় অপূর্ব সূক্ষ্ম কারুকার্যে। মলাটের সেই সূক্ষ্ম কাজ খুঁটিয়ে দেখলে খুঁজে পাওয়া যায় এক মনোরম চিত্র। সেই চিত্রে দেখা মেলে এক রাজহংসীর, সে বসে আছে একটি চন্দনগাছের ডালে! গোটা ছবিতে বিস্ময়করভাবে ফুটে উঠেছে তাদের নিবিড় সান্নিধ্য। সেই অপূর্ব মলাটের ভিতরে ডায়েরীর পাতায় ইবাদাত মিশিয়ে দেয় সেই চন্দনকাঠের সুবাস। নিপুণ শিল্পী সেই ডায়েরীটি এমনভাবে তৈরী করে যে মলাট বন্ধ থাকলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মনোরম চিত্র, আর মলাট খুললে চতুর্দিক ভরে যায় ডায়েরীর পাতার মিষ্টি গন্ধে।
মুঘল বাদশাহ বাবর সেই ডায়েরী দেখে তাজ্জব হয়ে যান। ইবাদাতের কপালে জোটে মোটা ইনাম। আর সেই বাদশাহী ডায়েরী জায়গা করে নেয় মুঘল বাদশাহের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়।
৪
কন্দর্পনারায়ণ মধ্য কুড়ির এক ঝকঝকে যুবক। সংস্কৃতের সাথে সাথে ফার্সী আর উর্দুভাষাতেও সে সমান পারদর্শী। তাঁর পাণ্ডিত্য আর বাকচতুরতা সকলকেই মুগ্ধ করে। স্বয়ং সম্রাট শাহজাহানও তার গুণের কদর করেন। তবে কন্দর্প শুধু বিদ্বানই নয়, রাজকার্যেও সে সমান পারদর্শী। মুঘল দরবারে শাসনকার্য পরিচালনায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে মুঘল সম্রাট বাকী সভাসদদের পাশাপাশি কন্দর্পেরও পরামর্শ নিয়ে থাকেন। সেইরকমই এক সমস্যার সমাধানে মুঘল বাদশাহ একবার কন্দর্পকে বাঙলার সুব্বায় পাঠালেন। বাঙলার সুব্বায় প্রজাদের বিদ্রোহ প্রায় লেগেই থাকে, অধিকাংশ বিদ্রোহই রাজস্ব সংক্রান্ত। বাঙলা থেকে রাজস্ব আদায়ে মুঘল বাদশাহদের বরাবরই বেশ বেগ পেতে হয়। কন্দর্প বাঙলার সেই এলাকায় গিয়ে বিনা যুদ্ধে শুধুমাত্র তার বাকচতুরতায় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনলেন। সেই এলাকা থেকে পুরো রাজস্ব আদায় করে দিল্লী ফিরলে বাদশাহ সন্তুষ্ট হয়ে কন্দর্পকে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে প্রদান করলেন একটি সূক্ষ্ম কারুকার্যময় বাদশাহী ডায়েরী।
কিন্তু মুঘল দরবারের সেই শান্তি সমৃদ্ধি আর বেশীদিন রইলো না। পুত্র ঔরঙ্গজেবের সাথে বৃদ্ধ মুঘল বাদশাহ শাহজাহানের বিরোধ বাধলে কন্দর্পনারায়ণ বাঙলায় চলে এলেন। বাঙলার একটি ছোট্ট গ্রামের সমস্ত জমি কিনে নিয়ে তিনি সেখানে স্থাপন করলেন তাঁর জমিদারি। সেই ছোট্ট গ্রামটির নাম নীলকান্তপুর। কুলীন ব্রাহ্মণ হয়েও কন্দর্পনারায়ণ কিন্তু কেবল একবারই পাণিগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নীলকান্তপুরের জমিদার বংশে সময়ের সাথে সাথে এই রীতি বদলে যায়। সমাজের সাথে তাল রেখে সেই বংশের কুলীন জমিদাররাও একাধিক বিবাহ করতে থাকেন। সেইসাথে জুড়ে যায় সতীদাহের রীতিও।
সেই বংশেরই জমিদার হরিনারায়ণ গ্রামের মানুষের মৃত্যুর পর তাদের দাহকার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নীলকান্তপুর গ্রামের ঠিক বাইরে গঙ্গাতীরে গড়ে তোলেন এক শ্মশানঘাট। হরিনারায়নের মৃত্যুর পর সেই শ্মশানঘাটেই তাঁর দাহকার্য সম্পন্ন করে নিশি ডোম। সেই সময় ডোম জমিদারের প্রিয় জিনিসপত্রের মধ্যে থেকে সরিয়ে ফেলে সেই বাদশাহী ডায়েরী।
সেই ডায়েরীর সান্নিধ্যে নিশি ডোমের মনেও পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনের আলোয় সে খুঁজে পায় এক অপরিণত কিশোরীকে, তার নাম ইন্দুবালা। ইন্দুবালার মধ্যেই ডোম খুঁজে পায় তার শেষ জীবনের সম্বল – স্নেহ আর সাহচর্য। সমাজের রক্তচক্ষু থেকে আড়াল করতে ইন্দুবালাকে সে তুলে দেয় পাদ্রী জোসেফ জেফারসনের হাতে। আর সেই বিশেষ মুহূর্তে সে তার আদরের ইন্দুর হাতে তুলে দেয় সেই আশ্চর্য বাদশাহী ডায়েরী।
ইন্দুবালা ইংল্যান্ডে গিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়। ইংল্যান্ডের সাসেক্স অঞ্চলে নিজের কাজের মধ্য দিয়ে সে পরিচিতি লাভ করে এমিলিয়া জেফারসন নামে। সেই ডায়েরী এমিলিয়াকেও জীবনে সঠিক পথ দেখায়, সেই আশ্চর্য ডায়েরী জায়গা করে নেয় এমিলিয়ার কাজের ঘরে টেবিলের বামদিকের ড্রয়ারে।
৫
দিল্লীর বুকে সুলতান ইব্রাহিম খান লোদির দুর্গ। কয়েকমাস হল সে দুর্গ দখল করে নিয়েছে বাবরের মুঘল সেনা। দিল্লীতে এখন প্রচণ্ড গরম। সেই গরমে কাহিল শীতল আবহাওয়ায় অভ্যস্ত মুঘল সেনারা। তাদের প্রবল ইচ্ছা এই গরমের দেশ ছেড়ে আবার স্বদেশে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু বাদ সাধছেন স্বয়ং মুঘল বাদশাহ। কারণ স্বদেশে ফিরলে তাঁকে আবার সামিল হতে হবে ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে। বাবরের ইচ্ছা যুদ্ধে জয় করা এই ভারতবর্ষের জমিতেই তিনি স্থাপন করবেন এক নতুন সাম্রাজ্যের বীজ। এখন থেকে এই নতুন দেশ, এই নতুন মাটিই হয়ে উঠবে মুঘলদের স্বভূমি। যুদ্ধে জয় করা দিল্লী ও তার আশেপাশের অঞ্চলকে তিনি সাজিয়ে তুলবেন তাঁর নিজের দেশের মত করে।
মুঘল বাদশাহের গোলাপ খুব প্রিয়। তাই ফারগানা প্রদেশ থেকে উট বোঝাই করে গোলাপ নিয়ে আসা হয়েছে দিল্লীতে। দিল্লী ও তার সংলগ্ন এলাকায় পারস্য দেশের বাগিচার অনুকরণে গড়ে তোলা হয়েছে মুঘলদের নিজস্ব বাগান। চারবাগ স্থাপত্য রীতি মেনে তৈরী সেইসব বাগানে গোলাপের পাশাপাশি অন্যান্য ফুলও জায়গা করে নিয়েছে।
দিল্লীর দুর্গের ভিতরও গড়ে তোলা হয়েছে মুঘল বাদশাহের পছন্দের এক বাগান। সেখানে স্থান পেয়েছে শুধুমাত্র মুঘল বাদশাহের পছন্দের কয়েকটি বিশেষ ফুলগাছ। সেই বাগান আলো করে রাখে এক লাল রঙের বসরাই গোলাপ। তার যেমন উজ্জ্বল রঙ, তেমনি মিষ্টি গন্ধ। সেই গোলাপের সুবাস মুঘল বাদশাহের মন ভাল করে দেয়। সেই গোলাপের মিষ্টি গন্ধে বাদশাহ ভুলে যান যে এই গোলাপ গাছ তাঁকে নজরানা দিয়েছিল তাঁরই সেনাদল থেকে বহিষ্কৃত এক সেনাপতি – জান মহম্মদ।
মুঘল সম্রাট শাহজাহান দিল্লীতে লাল কিলা গড়ে তুললে সেই বসরাই গোলাপ জায়গা করে নেয় লাল কিলা সংলগ্ন মুঘলদের নিজস্ব বাগানে।
তার বহুবছর পর বয়সের ভারে ক্লান্ত সেই গোলাপ গাছটিকেই মনে ধরে সেই বাগানের মালী রামচরণের। তখন সেই মুমূর্ষু গাছটিকে শুশ্রূষার জন্য রামচরণ গোপনে তার বাড়ীতে নিয়ে যায়। যত্ন পেয়ে সেই গোলাপ গাছ আবার তার পুরানো রূপ ফিরে পায়। সেই বসরাই গোলাপের মিষ্টি গন্ধে রামচরণের মাথায় আঁতর বানানোর চিন্তা আসে। তারপর একদিন সেই গোলাপের পাপড়ির নির্যাস দিয়ে রামচরণ বানিয়ে ফেলে সেই বিশেষ আঁতর যার নাম সে রাখে – বসরাই এ বাহার। সেই আঁতরের সুগন্ধেই রামচরণ পরিচিতি লাভ করে লক্ষ্ণৌ শহরে।
লক্ষ্ণৌ শহরে সিপাহী বিদ্রোহের সময় সেই দুঃস্বপ্নের রাতে রামচরণ সেই আঁতরের মিঠে গন্ধেই অ্যানকে আড়াল করে তাঁকে পৌঁছে দেয় রেসিডেন্সীর সুরক্ষিত ঠিকানায়। কিন্তু সেই রাতে স্ত্রী মোতিয়াকে হারিয়ে রামচরণের জীবনে নেমে আসে শোকের ছায়া।
রেসিডেন্সী অবরোধমুক্ত হলে অ্যান স্মিথ তাঁর কোলের শিশুকে নিয়ে উপস্থিত হয় রামচরণের বাড়ীতে। তখন বৃদ্ধ রামচরণ মোতিয়ার স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে অ্যানের হাতে তুলে দেয় সেই বসরাই গোলাপ গাছ।
সেই গোলাপ গাছটিকেই সম্বল করে অ্যান ফিরে যায় দেশে। ইংল্যান্ডে ফিরে অ্যান সেই বিশেষ গাছটিকে জায়গা করে দেয় তাঁর বাড়ীর পিছনের দিকের বাগানে। সেই বসরাই গোলাপ ধীরে ধীরে নতুন মাটি, নতুন আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। অ্যান সেই গাছটিকে আপনজনের মত যত্ন করে। মন খারাপ করলে সে সেই গোলাপ গাছটির পাশে গিয়ে বসে থাকে। সেই গোলাপের মিষ্টি গন্ধে অ্যান তখন তাঁর এক খুব কাছের মানুষকে পাশে পায়, সেই মিষ্টি গন্ধেই সাসেক্স অঞ্চলের সেই ছোট্ট বাগানে তখনও বেঁচে থাকে – বসরাই এ বাহার!
৬
দিল্লী শহরের মাঝে যমুনা নদীর তীর। শীতের রাতের কনকনে ঠাণ্ডায় নদীর পাড়ের ঘাসের জমি ভিজে গেছে শিশিরে। আধ খাওয়া চাঁদের হালকা আলোয় ঘাসের উপরের সেই শিশিরবিন্দুগুলিকে দেখে মনে হছে যেন মালা থেকে ঝরে পড়া অগণিত মুক্তা। সেই আধ খাওয়া চাঁদের অপূর্ণতার ছায়া পড়েছে যমুনার স্বচ্ছ নীল জলে। শীতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় সেই নীল জলে ওঠা ছোট ছোট ঢেউ গিয়ে ধাক্কা মারছে নদীর বাঁধানো পাড়ে। পাড়ের ধাক্কায় জলের ছিটে গিয়ে লাগছে নদীর পাড়ের গাছগুলিতে। সেই কনকনে ঠাণ্ডা শীতের রাতে যমুনার জলে পা ডুবিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছে একটি লোহার সেতু।
এখন বিংশ শতাব্দী, যমুনার উপর দিয়ে যাতায়াতের সুবিধার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে এই লোহার সেতু। ব্রিটিশদের শাসনে এখন বদলে গেছে দিল্লীর মানচিত্র। মুঘল বাদশাহদের শাসন কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে দিল্লী আজ হয়ে উঠেছে এক আধুনিক শহর। সময়ের সাথে সাথে সেই শহরের পরিধি বিস্তৃত হয়ে গড়ে উঠেছে এক বৃহত্তর দিল্লী। পুরানো দিল্লীর আশেপাশের গ্রামগুলি এখন সেই বৃহত্তর দিল্লীরই অংশ। সেই বৃহত্তর দিল্লীতেই যমুনা নদীর উপর এই লোহার সেতু।
সেই সেতুর একপ্রান্তে ঘন জনবসতি, আর তার অপরপ্রান্ত গিয়ে মিশেছে এক পরিত্যক্ত জঙ্গলে। সেই জঙ্গলে সারি সারি গাছপালা। সেই গাছপালার মধ্যে একেবারে নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি শ্বেতচন্দন। তার বুকের কাছে এক গভীর ক্ষত। চাঁদের আবছা আলোয় দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এক ক্লান্ত বৃদ্ধ ফকির তার বুকের পাঁজর বের করে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় মানুষ গাছটির নাম দিয়েছে পীরপঞ্জর। শ্বেতচন্দনের বুকের সেই গভীর ক্ষতেই লুকিয়ে আছে তার সব হারানোর স্মৃতি। বুকের ভিতর সব হারানোর সেই হাহাকার নিয়েই যমুনার তীরে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে পীরপঞ্জর!
****************************
পীরপঞ্জর – উপসংহার
১
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রায় দুই দশক কেটে গেছে। যুদ্ধের গভীর ক্ষত বুকে নিয়েই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে সাসেক্স। সেখানকার মানুষ যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিকে নিত্যসঙ্গী করে বাঁচতে শিখেছে। পশ্চিম সাসেক্সে রয়্যাল রেজিমেন্টের অফিসের ভিতরের এক খোলা মাঠে যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে এক স্মৃতিসৌধ। সেই স্মৃতিসৌধের পাশেই এক শ্বেতশুভ্র মার্বেল ফলকে খোদাই করা আছে যুদ্ধে নিহতদের নাম, খুঁজলে সেই তালিকায় মিলে যাবে বহু চেনা পরিচিতের নাম। প্রতি রবিবার সকালে, সাসেক্সের সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয় সেই স্মৃতিসৌধের দরজা। তখন সেই দরজা দিয়ে এগিয়ে আসে নিহতদের পরিবারের লোকজন। তাঁদের হাতে ধরা থাকে পুষ্পস্তবক। সেই ফুল দিয়ে তাঁরা আপনজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। সেই দর্শনার্থীদের ভিড়ে খুঁজে পাওয়া যায় সাসেক্সের বহু পরিচিত মুখ। কয়েকবছর আগেও সেই পরিচিতদের ভিড়ে দেখা মিলতো এক চল্লিশোর্ধ ব্রিটিশ মহিলার, তাঁর মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। মহিলা সুন্দরী, কিন্তু তাঁর চোখে-মুখে এক অপূর্ব বৈরাগ্য। তাঁর চোখের চাহনিতে বুঝি উত্তাল ইংলিশ চ্যানেলও শান্ত হয়ে যায়! সেই শান্ত স্থির দৃষ্টির পিছনে ঢাকা পড়ে যেত তাঁর একজোড়া হরিণীর চোখ। সেই ব্রিটিশ মহিলার হাতে থাকতো একগোছা সাদারঙের ফুল। সেই সাদারঙের ফুলের গোছার মাঝে মিশে থাকতো একজোড়া লাল গোলাপ।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সোফি ফ্রান্স থেকে সাসেক্সে ফিরে আসে। ইতিমধ্যে উইলিয়ামও ভারতবর্ষ থেকে ফিরে এসেছিল কফিনবন্দী হয়ে। সেই কফিনের সাথেই ফেরত এসেছিল ধূলা মলিন কয়েকটি লেখার পাতা। সেই পাতাগুলিতে যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও লেখা হয়েছিল কয়েকটি মন ভাল করা কবিতা। উইলিয়ামের শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাঁর কফিনবন্দী দেহটি শায়িত হয়েছিল তাঁর বাড়ীর পিছনের দিকের বাগানে আর সেই কবিতার পাতাগুলি স্থান করে নিয়েছিল সোফির বাড়ীর টেবিলের বামদিকের ড্রয়ারে। সেই জীর্ণ পাতাগুলির মাঝেই সোফি একদিন খুঁজে পেয়েছিল একটি শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ।
যুদ্ধ থেকে ফিরে সোফি নিজেকে সমাজসেবায় নিয়োজিত করে। যুদ্ধক্ষেত্রে আর্ত মানুষের সেবার মধ্য দিয়ে সোফির মন যে সুখ পেয়েছিল, যুদ্ধ থেকে ফিরে সেই অনুভূতিকেই সে পাথেয় করে এগিয়ে চলে। উইলিয়াম আর নিজের বাড়ী নিয়ে সে গড়ে তোলে এক প্রতিষ্ঠান। সেখানে আশ্রয় পায় যুদ্ধে বাস্তুহারা সাসেক্সের বহু মানুষ।
সোফি উইলিয়ামদের প্রতিও তাঁর কর্তব্য ভুলে যায় নি। তাই উইলিয়ামের মত উঠতি লেখকদের নিয়ে সে গড়ে তোলে এক সংগঠন। প্রতি রবিবার দুপুরে সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে উইলিয়ামের বাড়ীর বৈঠকখানায় বসে কবিতা পাঠের আসর। সেই আসরে উঠতি লেখকরা নিজেদের রচনা সকলের সামনে তুলে ধরে। সকলের মাঝে তাঁদের প্রতিভা পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পায়। সোফিও বিশেষ নজর রাখে যাতে উইলিয়ামের মত তাঁরা কেউ সমাজের বুক থেকে হারিয়ে না যায়।
কর্মব্যস্ত দিনের শেষে সোফি রোজ সেই ধূলা মলিন লেখার পাতাগুলি নিয়ে বসে। সেইসব জীর্ণ পাতার মন ভাল করা কবিতাগুলি সে এক এক করে তুলে রাখে একটি ডায়েরীর পাতায়। সেই ডায়েরীর মলাট অপূর্ব সূক্ষ্ম কারুকার্যে ভরা। সেই সময় লেখার কাজে সোফি ব্যবহার করে একটি লম্বা সাদা পালকওয়ালা লেখার কলম। সেই ডায়েরী আর কলম অতি সযত্নে রাখা ছিল সোফির পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। পরিবারের এই দুর্মূল্য জিনিস দুটিই সোফি একদিন তুলে দিতে চেয়েছিল উইলিয়ামের হাতে। লেখার সময় সোফির লম্বা চুলের খোঁপায় গোঁজা থাকে একটি লাল রঙের বসরাই গোলাপ। তার যেমনি উজ্জ্বল রঙ, তেমনি মিষ্টি গন্ধ। সেই গোলাপ সে তুলে আনে উইলিয়ামের বাড়ীর পিছনের বাগান থেকে। এখনও সেই বাগানকে আলো করে রাখে সেই বসরাই গোলাপ, যা একদিন ভারতবর্ষ থেকে ইংল্যান্ড পাড়ি দিয়েছিল উইলিয়ামের পিতামহী অ্যান স্মিথের সাথে। মন ভাল করা এই কবিতাগুলির মধ্য দিয়েই সোফি এখন উইলিয়ামকে পাশে পায়। লেখার সময় সোফির চারপাশ ভরে থাকে চন্দনের মিষ্টি গন্ধে।
২
সোফির কাজ শেষ হয়েছে বছর কয়েক আগে। সেই সূক্ষ্ম কারুকার্যময় লেখার ডায়েরীর আনকোরা পাতাগুলি ভরে গেছে মন ভাল করা কবিতায়। নিজের কাজ শেষ করে সোফিও জায়গা করে নিয়েছে উইলিয়ামের পাশে। উইলিয়ামের বাড়ীর পিছনের দিকের বাগানে এখন পাশাপাশি শায়িত আছে দুটি কফিন – একটিতে লেখা উইলিয়াম স্মিথ, আর পাশেরটিতে সোফি জেফারসন। যে দুটি মানুষ জীবনে একে অপরের পাশে থেকে চলতে চেয়েছিল, তাঁরাই মৃত্যুর পর পাকাপাকিভাবে একে অপরের পাশে জায়গা করে নিয়েছে।
এখনও প্রতি রবিবার দুপুরে উইলিয়ামের বাড়ীর বৈঠকখানায় বসে কবিতা পাঠের আসর। সেই বৈঠক শুরু হওয়ার ঠিক আগে সকলে মিলে প্রার্থনা করে সোফির বাড়ীর উপাসনাকক্ষে। তাতে সামিল হয় বাড়ীর আশ্রিতরাও। সেই প্রার্থনার সময় উপাসনাকক্ষের বেদির উপর পাশাপাশি রাখা থাকে একটি সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ডায়েরী ও একটি লম্বা সাদা পালকওয়ালা লেখার কলম। আর পাশের ফুলদানিতে সাজানো থাকে লালরঙের একগোছা বসরাই গোলাপ।
৩
বৃহত্তর দিল্লীতে যমুনার বুকে নবনির্মিত এক লোহার সেতু, তার একপ্রান্তে ঘন জনবসতি, আর অপরপ্রান্তে সেই পরিত্যক্ত জঙ্গল। সেই ঘন জনবসতি থেকে ভেসে আসছে বিকালের আজানের সুর। সেতুর অপরপ্রান্তের পরিত্যক্ত জঙ্গলে যমুনার তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি নীরব প্রাণ। তার বুকে এখনও গভীর ক্ষত। তবে তার বুকের ভিতর বহুবছর ধরে চলতে থাকা হাহাকার এখন থেমে গেছে। বহুবছর পর সব হারানোর নির্মম যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে পীরপঞ্জর।
এখন প্রতি রবিবারের ঠিক এই সময়টায় যখন যমুনার জলে সূর্যাস্তের ছায়া পড়ে, তখন বহুদূরের কোনো এক উপাসনাকক্ষে সমবেত মানুষের প্রার্থনার মাঝে সে আবার ফিরে পায় সেই রাজহংসীকে। প্রার্থনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা একইভাবে ঘনসংলগ্ন থেকে সময় অতিবাহিত করে। তারপর একসময় প্রার্থনা শেষ হয়, উপাসনার বেদি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় সেই লম্বা সাদা পালকওয়ালা কলমটিকে। বিদায় নেয় সেই রাজহংসী। বিদায়লগ্নে তার ভারী ইচ্ছা করে পাশে রাখা ফুলদানি থেকে একটি বসরাই গোলাপ তুলে তার প্রিয়তমাকে দিতে। কিন্তু দিনের এই একটিই সময় নিজের নতুন অস্তিত্ব নিয়েও তার আফসোস জাগে। সন্ধ্যার অন্ধকারে কয়েকফোঁটা জল তখন পীরপঞ্জরের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যমুনার জলে!
*********সমাপ্ত*********
শেষের কিছু কথা………………………
পীরপঞ্জর কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল একজন পীরের হৃদয়ের অন্তঃস্থল। হৃদয়ের সেই অন্তঃস্থলেই পীর ধারণ করে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতের কাহিনী, তাঁর নিজের জীবনে পাওয়া ও না-পাওয়ার নানা স্মৃতি। বুকের ভিতর নিজের জ্বালা যন্ত্রণার স্মৃতি বহন করেও পীর অন্য মানুষকে জীবনে সঠিক পথ দেখায়। নিজের বুকের ভিতর চলতে থাকা হাহাকারকে বাইরে প্রকাশ না করে সে বরং অন্য মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করে। ব্যক্তিগত জীবনে বঞ্চনার সাক্ষী হয়েও সেই পীর মানবসমাজের বুকে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো অন্য মানুষের ইচ্ছাপূরণের মধ্য দিয়েই তাঁর নিজের জ্বালা যন্ত্রণা কিছুটা লাঘব হয়। তখন হয়তো সবার অলক্ষ্যেই তাঁরও দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কয়েকফোঁটা জল!
এই গল্পটি একজন খুব কাছের মানুষকে উৎসর্গীকৃত, তিনি জীবনে ইতিহাস নিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে, তাঁর সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি!
Text Copyright ©2024 by Suman Saha All rights reserved.
